অভিবাসী ও প্রান্তিকবান্ধব প্রার্থীরাই সফল: জয়নাল আবেদীন
"নিউইয়র্কের রাজনীতিতে পরিবর্তন অনুধাবিত হচ্ছে। মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান প্রজন্ম যুদ্ধ চায় না, তারা শান্তি চায়। যারা শান্তির পক্ষে, খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে, সমাজের অবহেলিত-নিষ্পেষিতদের পক্ষে কথা বলবে, ভবিষ্যতের রাজনীতি সেদিকেই ধাবিত হবে"- নিউইয়র্কের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনাকালে কথাগুলো বলেছেন জয়নাল আবেদীন। গত ২ জুলাই প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার "টক অব দ্য উইক"-এর রাজনৈতিক আলোচনায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। কথা বলেন ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচন নিয়ে।
গত ২৩ জুনের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের জোরালো অংশগ্রহণ এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নির্বাচনে বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে ৫ জন প্রার্থী লড়াই করেছেন। খোরশেদ খন্দকার কাউন্টি কমিটিতে জিতলেও অ্যাসেম্বলির মূল পদগুলোতে প্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত জয় পাননি। এ প্রসঙ্গে জয়নাল আবেদীন বলেন, "ব্লু স্টেট নিউইয়র্কের এই নির্বাচন নিউইয়র্কবাসীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই শহরের মোট ভোটারের মধ্যে ৩.৫ মিলিয়ন ডেমোক্র্যাট সমর্থক, বাকি ০.৫ মিলিয়ন রিপাবলিকান সমর্থক। নিউইয়র্ক স্টেটে যারা ডেমোক্রেটিক পার্টিতে জয়ী হবে, তারাই আগামী সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে এবং বিজয়ী হবে।"
শুধু নিউইয়র্ক নয়, কলোরাডো এবং পেনসিলভানিয়াতে প্রগতিশীল সোশ্যালিস্টরা বড় জয় পেয়েছেন। অনেকের প্রশ্ন, নিউইয়র্কের রাজনীতি তবে কি পুরোপুরি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টদের দখলে চলে যাচ্ছে কিনা। এ প্রসঙ্গে জয়নাল আবেদীন নিজ অভিমত জানিয়ে বলেন, "তার মানে নিউইয়র্ক যে সোশ্যালিস্ট হয়ে যাচ্ছে তা নয়, নতুন প্রজন্ম যুদ্ধবিমুখ হচ্ছে, তারা চায় অর্থনৈতিক মুক্তি। যে নেতা বা প্রার্থী এই বিষয়গুলো শনাক্ত করে কাজ করছেন, পরবর্তীতে তারাই এগিয়ে যাচ্ছেন।"
সঞ্চালিকা সোহানা নাজনীন প্রশ্ন রাখেন, এত বড় একটি সাউথ এশিয়ান কমিউনিটি হওয়া সত্ত্বেও কেউ জয়ী হতে পারলেন না, এটা কি আমাদের কমিউনিটির জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা? নাকি একে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ইতিবাচক শুরু হিসেবে দেখব? জয়নাল আবেদীন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "বাঙালি কমিউনিটির অনেকেই নিজেকে ডেমোক্র্যাট হিসেবে দাবি করেন কিন্তু ভোটার হন না, ভোটকেন্দ্রে যান না। তাদের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবণতা কম। নিউইয়র্কের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রাইমারি ভোটের এই বিষয়টিকে আমি দুইভাবে মূল্যায়ন করব। এই নির্বাচন যেমন একটি আশার আলো, তেমনিভাবে আমাদের আগামী দিনের পথচলার জন্য নির্দেশনা দিচ্ছে। অন্য কমিউনিটির মতো ধীরে ধীরে বাঙালি কমিউনিটিও প্রতিষ্ঠিত হবে। অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার আদায় করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এজন্য কমিউনিটি অ্যাক্টিভিটি বাড়াতে হবে, সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকতে হবে, স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। লোকাল লিডারশিপ ছাড়াও অন্য লিডারশিপে কাজ করতে হবে; যেমন—ট্যালেন্ট অ্যাডভোকেসি দেখানো, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাহায্য করা ইত্যাদি। অর্থাৎ সারা বছর কাজ না করে শুধু নির্বাচনের আগে দু-তিন মাস সমাজসেবী হয়ে সহজে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের অনেক আগে থেকে নেম রিকগনিশন নিয়ে একটা নির্দিষ্ট এলাকাকে টার্গেট করে কতগুলো ইস্যুভিত্তিক কাজ করতে হবে। জনগণের মনে স্থান করার মাধ্যমেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব।"
এইচ বি রিতা প্রশ্ন রাখেন, "শামসুল হকের মতো মাত্র ১ ভোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই যেখানে আশা জাগায়, সেখানে বাকি প্রার্থীদের এই বিশাল ব্যবধানের পরাজয় -তবে কি আমাদের প্রার্থীরা কেবল 'বাঙালি আবেগের' ওপর ভরসা করে নামছেন? নাকি মূলধারার অন্য রেস বা ব্লকের ভোটারদের মন জয় করার মতো বাস্তবসম্মত কোনো নির্বাচনী কৌশল বা হোমওয়ার্কতাদের ছিল না?
জয়নাল আবেদীন বলেন, "পুরো নিউইয়র্ক স্টেটে প্রার্থী ছিল ১৫০ জন, তার মধ্যে নিউইয়র্ক শহরেই ছিল ৬০ জন। এই ৬০টি আসনের ৫টি আসনে বাঙালি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যার শতকরা হিসাব দাঁড়ায় ১২% এর মতো, যা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। আমি তাদের সাহসিকতাকে অভিনন্দন জানাই।"
নিউইয়র্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের কমিউনিটির সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, "প্রার্থী হিসেবে অনেক আগে থেকে তাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ভোটের জন্য নির্বাচিত এলাকার সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে হবে। সেই এলাকার মানুষের মনোভাব, চাহিদা, দাবি-দাওয়া ভালোভাবে স্টাডি করতে হবে। শুধু বাংলাদেশিদের মনোভাব বুঝে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এটি একটি কসমোপলিটান শহর, যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীরা এসেছেন। তুলনামূলকভাবে অনেক অভিবাসীর পরে বাঙালির আগমন, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে আগমন বেশি। সিটি, স্টেট এবং ফেডারেল সম্পর্কিত কাজ করে প্রার্থীকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি একজন কমিউনিটির নেতা। সকল ধর্মের উপাসনালয়ে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সাথে, স্কুলের কমিটির সাথে, ব্যবসায়িক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। ডিস্ট্রিক্ট ৩০-এর শামসুল হককে আমি দেখেছি, গত এক বছর ধরে উনি প্রস্তুতি নিয়েছেন। তার ফলাফলও আমরা দেখতে পাচ্ছি।"
ভিন্ন প্রসঙ্গে মেয়র জোহরান মামদানী সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিমধ্যে ৬ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। নিউইয়র্ক সিটির জন্য প্রায় ১২৬ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘোষণা করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, অতিরিক্ত খরচ নিউইয়র্ক সিটিকে ভবিষ্যতে বড় আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে। বিশেষ করে, এই বাজেট মেলাতে গিয়ে তিনি পেনশন ফান্ডের পেমেন্ট বা বাধ্যবাধকতা পিছিয়ে দিয়েছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সিটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
তাঁর দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান প্রাপ্তির খতিয়ান সম্পর্কে জয়নাল আবেদীন বলেন, "নিউইয়র্ক সিটির বাজেটে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল, যা জোহরান মামদানী কমিয়ে আনতে পেরেছেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, তিনি অপরাধের মাত্রা কমিয়েছেন। এই ছয় মাস সময়ে জোহরান মামদানী ভালো কাজ দেখিয়েছেন, যার জন্য মামদানীর এন্ডোর্সড প্রার্থীরা পাস করছে।"
পেনশন ফান্ডের কথায় তিনি জানান, "পেনশন ফান্ডের জন্য একজন কমপট্রোলার নির্বাচিত হয়েছেন যিনি মামদানীর সাথে অ্যালাইন ছিলেন না। তাছাড়া মামদানী তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রেখেছেন। যেমন—ইউনিভার্সাল চাইল্ড কেয়ার চালু, দুই বছরের জন্য রেন্ট ফ্রিজ। 'ট্যাক্স দ্য রিচ' স্লোগান শহরের চারদিকে, তাই ধনী ব্যবসায়ীরা নিউইয়র্কের জন্য সুফল বয়ে আনবে। তবে মেয়র মামদানীকে জীবনযাত্রার মান বাড়াতে হবে, তাহলে খেটে খাওয়া মানুষের আয় বাড়বে।"
সর্বশেষে জয়নাল আবেদীন বাঙালি কমিউনিটির প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আগে আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ভোটার হয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সুষ্ঠুভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে। জনগণের সুবিধার জন্য ভোটকেন্দ্রগুলো সকাল ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সেখানে ভোটারদের চেয়ে সাহায্য কর্মীর সংখ্যা বেশি। লাইন নেই, কোনো ধরনের ঝামেলা নেই। আমেরিকান জীবনে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্যই আমাদেরকে ভোট দিতে হবে।"
এভাবেই সেদিনের অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন সোহানা নাজনীন এবং পরিচালনা ও কারিগরি সহায়তায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার "টক অব দ্য উইক" অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন