https://www.prothomalony.com/
9100
bangladesh
চলুন, দেশে চলমান ভারতীয় পণ্য বয়কট বিষয়ে কথা বলার পূর্বে ভারতের স্বদেশি আন্দোলন দিয়ে আলাপটা শুরু করি। দেখি উইকপিডিয়া কী বলে সেইস্বদেশি আন্দোলন সম্পর্কে। উইকিপিডিয়া বলছে, 'স্বদেশি আন্দোলন ভারতেরস্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অংশ। স্বদেশি আদর্শে উদ্বুদ্ধ এই আন্দোলনেরপ্রধান উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ভারতথেকে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদসাধন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারউন্নতিসাধন। আন্দোলনের রণকৌশলের অন্তর্গত ছিল ব্রিটিশ পণ্য বয়কটএবং দেশীয় শিল্প ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নতিসাধন।' অর্থাৎ স্বদেশিআন্দোলন ছিলো শুধু বৃটিশ শক্তিকে উচ্ছেদের জন্য নয়, দেশের সামগ্রিকঅর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতিসাধনের জন্য।
বৃটিশ তাড়ানো কেবল নয়, দেশিয় অর্থনীতির উন্নয়নও ছিলো স্বদেশি আন্দোলনের মূলে। তাই যদি হয় তাহলে বাংলাদেশের চলমান ভারতীয় পণ্য বয়কটের বিষয়টি কেন কারো কারো গাত্রদাহের কারণ হচ্ছে। তাদের কথায়, লেখায় মনে হচ্ছে এটা ভয়ংকর একটি খারাপ কাজ। অথচ বাংলাপিডিয়া স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে বলছে, স্বদেশী আন্দোলনকে সফল করার জন্য'বর্জননীতি' ছিল মূল হাতিয়ার। এখানে আরেকটি বিষয় যোগ করছি, সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে উঠা আলোচনার প্রেক্ষিতে। স্বদেশি এবং রবীন্দ্রনাথ প্রশ্নে বাংলাপিডিয়ার এ কথাটুকুও প্রাসঙ্গিক। বাংলাপিডিয়া স্বদেশি আন্দোলকে দুটি মূলধারায় ভাগ করেছে। এক, গঠনমূলক স্বদেশি, দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক চরমপন্থা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম ধারার। এ সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া বলছে, 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক চিত্রিত ঐতিহ্যবাহী হিন্দু সমাজের পুনর্জাগরণেরমাধ্যমে গ্রামসমূহে গঠনমূলক কাজের ভেতর দিয়ে এটা প্রকাশ লাভ করে।'নোট নিয়ে রাখেন, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আলোচনার জন্য এটুকু গুরুত্বপূর্ণ। যিনি স্বদেশি বলতে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু সমাজের পুনর্জাগরণ বিষয়টি সামনে এনেছিলেন।
সুতরাং বয়কট ব্যাপারটি মূলত রাজনৈতিক অস্ত্র। প্রতিবাদের ভাষা। আর ভারতীয় পণ্য বয়কট বিষয়টিও তাই। আমাদের দেশে তৈরি পণ্যের বদলে ভারতীয় পণ্য কেনাকে উৎসাহিত করাটা কোনো কাজের কথা নয়। অথচ এই অকাজটি অনেকেই করছেন। ভারতীয় 'কলগেট' টুথপেস্টের আধিপত্যে আমাদের টুথপেস্টগুলি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ভারতীয় প্রসাধনীর কাছে মার খাচ্ছে আমাদের দেশে উৎপাদিত প্রসাধনী। অথচ মানের দিক তুলনা করতে গেলে আমাদের বেশিরভাগ পণ্য ভারতীয় পণ্যের চেয়ে উন্নত। অথচ ধারণা দেয়া হয়েছে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের পণ্যের চেয়ে ভালো। একশ্রেণির পরান্নভোজী এমন নীরব ক্যাম্পেইন চালিয়েছেন দিনের পর দিন। যার ফলে দেশের শিল্প-কারখানা সাথে অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি বাদে অন্য শিল্পকারখানা দাঁড়াতেই পারেনি এমন ধারণারবিপরীতে। যারফলেই দু'দেশের বাণিজ্য বৈষম্য প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। বৈষম্যের পরিসংখ্যান দিয়ে আর লজ্জিত হতে চাই না বলেই দিলাম না। একইসাথে ভারতের চিকিৎসা বাণিজ্যের বিষয়টিও পুনরুল্লেখ করলাম না।তুললাম না টাঙাইলের শাড়ি আর রসগোল্লার জবরদখল নিয়ে কথাও।
জানি, এখানে অনেকে বলবেন, আমাদের তো অনেক পণ্য বাধ্য হয়েই আমদানি করতে হয়। হ্যাঁ, আমাদের যা নেই, তা আমদানি করতে দোষ নেই। কিন্তু আমদানি শুধু ভারত থেকেই করতে হবে কেন? পেঁয়াজের কথাই ধরি। কাগজে দেখলাম ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগেও করেছিলো। আমরা তুরস্ক, মিশরসহ অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছিলাম। আমরা গর্ব করে বলি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা। কিন্তু এই বুলি যে কতটা ফাঁকা তা ভারত থেকে চাল, পেঁয়াজ, চিনি সর্বশেষ আলু আমদানি করেই প্রমাণ দিয়েছি। আমাদের কেন যেন আমদানির বিকল্প কোনো দেশ নেই। ভিয়েতনাম বিশ্বে চাল উৎপাদনে শীর্ষে। আমরা ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির চিন্তা করতে পারি। করতে পারি অন্যদেশ থেকেও। কিন্তু না আমাদের ভারত থেকেই আমদানি করতে হবে। কেন করতে হবে, এই প্রশ্নটা সঙ্গত। কিন্তু অনেকেই করেন না, কারণ করে লাভ নেই কিংবা প্রশ্নের উত্তরটা জানা বলে।
যাকগে, ভারতীয় পণ্য বয়কট প্রশ্নে কথা উঠতে পারে, অন্যদেশের পণ্য বয়কট নয় কেন, এমনটা বলে। এই কথার উত্তর উইকিপিডিয়ার স্বদেশি আন্দোলনবিষয়েই রয়েছে। অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ বিষয়ে যাদের জানা আছে তারা নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন করবেন না। আমাদের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তৈরি পোশাক। দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে ভারত। আমাদের ঔষধ, চামড়া ও কুটির শিল্পকেও ভারতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে বিদেশের বাজারে। দেশের বাজারে আমাদের অনেক পণ্যই মার খাচ্ছে ভারতীয় পণ্যের কাছে। এখানে গুণগত মানের চেয়ে একটা শ্রেণির প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের প্রভাবই বেশি। আমাদের তীরসহ অন্যান্য গুণগত মানে এগিয়ে থাকা সয়াবিন তেল মার খাচ্ছে ভারতীয় আদানি গ্রুপের রূপচাঁদা'র কাছে।আমাদের স্কয়ারের নারিকেল তেল জুঁই মার খাচ্ছে নিম্নমানের প্যারাসুটের কাছে। এমন অসংখ্য নজির রয়েছে। কিন্তু কারো কারো এসব নজির দৃষ্টিবদ্ধ হয় না। সঙ্গতই প্রশ্ন উঠতে পারে, তারা কি অন্ধ? না তারা, 'পরান্ধ', পরের প্রতি প্রেমে অন্ধ? এর উত্তর একমাত্র তারাই দিতে পারবেন। তবে আমাদের দেশপ্রেমের পরীক্ষা দেয়ার সময় শুরু হয়েছে। সময় এসেছে আমাদের শিল্প-কারখানাকে প্রমোট করার। নিজেদের অর্থনীতির ভিত মজবুত করার। এর মূলত কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন