https://www.prothomalony.com/

8494

north-america

উত্তর আমেরিকা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ০৭:৩২

অমর একুশে বইমেলা : বাঙালি মনন ও উৎকর্ষের স্মারক

আবার চলে এলো বাঙালির প্রাণের মেলা—অমর একুশে গ্রন্থমেলা, যা আমাদের কাছে একুশের বইমেলা নামেই সমধিক পরিচিত।

বইমেলা’ কিংবা ‘গ্রন্থমেলা’ শব্দ দু’টির যেকোনো একটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলা একাডেমী আয়োজিত একুশে বইমেলা। যে মেলা বইপ্রেমী মানুষের প্রাণে দোলা দেয়। কোনো এক অদৃশ্য শক্তিবলে লাখো মানুষকে টেনে আনে একাডেমীর বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে।

বর্ধমান হাউস ও এর আশপাশ ঘিরে জমে ওঠে লেখকদের জমজমাট আড্ডা।

কাটে লেখক প্রকাশকদের নির্ঘুম রাত। প্রকাশিত হয় হাজার হাজার বই। নতুন বইয়ের মৌ মৌ গন্ধে মোহিত হয় মেলায় আসা ক্রেতা, দর্শনার্থী। বিক্রি হয় লাখ লাখ কপি বই।
ভিড় ঠেলে প্রয়োজনীয় বইটি হাতে পাওয়ার পর আনন্দে চিক চিক করে ওঠে মুখ। তারপর বইটি বগলদাবা করে প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়ার চেষ্টা। মঞ্চের সামনে বসে আলোচনা কিংবা দাঁড়িয়ে একটু গান শোনা। এসবই আমাদের কাছে খুব চেনা এবং জানা একটি বিষয়। কিন্তু আমরা অনেকেই এই মেলার ইতিহাস জানি না। 

অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমাদের কাছে ব্যাপকভাবে একুশে বইমেলা নামেই পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউজ প্রাঙ্গণে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর[১] কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিলো চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকদের লেখা বই। এই বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে অন্যান্যরা অণুপ্রাণিত হোন। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমীকে মেলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি; এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম "অমর একুশে গ্রন্থমেলা"র আয়োজন সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। সেই ৩২টি বইয়ের ক্ষুদ্র মেলা কালানুক্রমে বাঙালির সবচেয়ে স্বনামধন্য বইমেলায় পরিণত হয়েছে। বাংলা একাডেমী চত্বরে স্থান সংকুলান না-হওয়ায় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষা শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নামে ভাগ করা হয়। এবার একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণকে চারজন ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, বরকত ও শফিউরের নামে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মেলা চলাকালীন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই বিভিন্ন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এছাড়া মেলাতে লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সাথে মতবিনিময় করেন। মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন মোড়ক উন্মোচিত বইগুলোর নাম, লেখক ও প্রকাশকের নাম ঘোষণা করা হয় এবং দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়।

মানসম্মত বই মানুষকে উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে। মানুষ যদি উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের চর্চা না করে, তাহলে দেশের চলমান উন্নয়ন অর্থবহ হবে না, যা বলাই বাহুল্য। অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বই প্রকাশিত হচ্ছে। বইমেলার সার্বিক কর্মকাণ্ড যাতে সফলভাবে সম্পন্ন হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। অতীতে লক্ষ করা গেছে, কর্তৃপক্ষের অসতর্কতার কারণে বইমেলায় এসে শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা। বইমেলাকে কেন্দ্র করে দেশে মননশীলতার চর্চায় যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, তা যাতে আরও বেগবান হয়, সেদিকেও কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।

বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলা নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা থাকলেও রুচি, উৎকর্ষ আর পরিশীলনের দিক থেকে বইমেলা এক অনন্য ব্যাপার। বইমেলা হয়ে উঠেছে বাঙালি মনন ও উৎকর্ষের স্মারক। সামষ্টিক সৃজনের উর্বর জমিন। বইমেলার কথা ভাবলেই প্রাণে খুশির দোলা লাগে, উৎফুল্ল হয়ে উঠে মন। বইমেলা আনন্দ, মিলন আর ভাব আদান-প্রদানের এক গতিশীল স্টেশন। 

কত সাজে, কত বিন্যাসে কত বই আসে বইমেলায়। এ জ্ঞানগোলা বাঙালির মননের খনি। মেলায় আসা বইয়ের বিস্তুতি ও বিষয় পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব। ১৯৭২ সালে ৩২টি বই দিয়ে শুরুর সেই যাত্রাপত্র আজ কতো ব্যাপক ভাবা যায়? বইমেলার আকারগত বিশালত্ব সাক্ষ্য দিচ্ছে জ্ঞান চর্চায় জাতি বেশ এগিয়েছে। আমাদের অগ্রগতি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন বয়ানে ধরা যাবে না। মেধা ও মননের চর্চায় ষাটের দশকের এক ক্ষুদ্র প্রয়াস কীভাবে মহীরুহে পরিণত হলো সেই বিষয়টা তলিয়ে দেখা দরকার। 

বইমেলা বাঙালির ভিন্ন উচ্চতার এক বাকস্ফূর্তি। এ স্ফূর্তির থরে থরে সাজানো চিন্তা-চৈতন্য, মনীষা ও সমীক্ষার অনুরণন। একটি জাতির সামষ্টিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশের এত বড় প্ল্যাটফর্ম দুনিয়ায় খুব বেশি নেই। ফ্রাঙ্কফুর্ট, লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্ক বা কলকাতার বইমেলার বিবেচনায় অমর একুশে বইমেলা দাঁড়িয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে। 

বইমেলা হলো ত্রিমাত্রিক শক্তির নিগুঢ় মিলন। প্রথমত, ভাষা চেতনা। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। এ  মাসে বাঙালি রক্ত দিয়ে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। ফেব্রুয়ারিজুড়ে চলে বইমেলা। বইমেলা যেমন একুশের চেতনাকে জাগিয়ে তুলে, আবার একুশের চেতনা জাগিয়ে তুলে বইমেলাকে। একুশের সঙ্গে বইমেলার এ সম্পর্ক দারুণ মিথোজীবিক। এ মিথোজীবিক সম্পর্ক একুশের চেতনার প্রায়োগিক ভিত্তি তৈরি করেছে। একুশকে ঘিরে বইমেলাকেন্দ্রিক এ উৎসবের মধ্য দিয়ে একুশের চেতনা ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বইমেলার মূল আধেয়গত বিষয় হলো-অমর একুশের চেতনা। এই বইমেলা সে মসৃণপথ তৈরি করছে নিপুণভাবে। 
এখন বইমেলার স্থান সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের বাঙালির জাতিসত্তার উদ্বোধনের স্মৃতিবাহী একুশের ঐতিহ্যের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা যুক্ত হয়ে মেলাটি এখন নতুন আঙ্গিক, পরিসর ও মাত্রিকতায় স্থিত হলো। 

দ্বিতীয়ত. একুশে বইমেলার বুকস্টলগুলোর ডিজাইন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যেখানে বাঙালির নিজস্ব ডিজাইন শৈলীর এক মহামিলন ঘটে। স্টলের আকার, কালার কোড, উপকরণের ব্যবহার, অক্ষরবিন্যাস ও কাঠামো সবমিলিয়ে মেলার আঙ্গিক হয়ে ওঠে বাঙালিয়ানার এক মহাছবি। এ মহাছবির মূল আখ্যান আপন করার শক্তি। বইমেলার সার্বিক বিন্যাস দর্শনার্থীদের এ অনুভব দেয় যে আহ্! এই তো আমার প্রাণসংলগ্ন ব্যাপার। এ মেলা বিচ্ছুতির স্মারক নয় বরং সংযোগের উপলক্ষ। 

বইমেলাকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে এক অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। বলা যায় এ মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এখন অনেক প্রকাশনা শিল্পে অর্থ লগ্নি করছেন। অমর একুশে বইমেলা এক মাস ধরে চলে। সময় বিবেচনায় সম্ভবত এটিই পৃথিবীর দীর্ঘস্থায়ী বইমেলা। এই মেলায় মানুষের আগ্রহ এতই বেশি যে শুধু শুধু ঢাকাবাসী নয়, বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও মফস্বল এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও জ্ঞান পিপাসুরা এতে অংশ নেন।
অমর একুশে বইমেলা দেখিয়ে দেয় বাঙালির চিন্তার সক্ষমতা। সৃষ্টিশীলতা ও মননের বিবেচনায় বইমেলা সমাজের খোলাজানালা। অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁর উল্লিখিত নিবন্ধে বলছেন- বই মেলায় গেলে পাশাপাশি সাজানো বইয়ের দিকে তাকালে বইমেলার আরেকটি বৈশিষ্ট্য সহজেই চোখে পড়ার কথা, তা হল সহিষ্ণুতা। একই বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্যের বইয়েরা নির্বিবাদে সহাবস্থান করে, যেমন সমাজে থাকার কথা, রাষ্ট্রে থাকার কথা। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে ১৯৭২ সালে যে মেলার সূচনা হয়েছিলো, গত কয়েক দশক ধরে যা অব্যাহত থেকেছে তার মর্মবস্তু যদি কিছু থাকে তা হচ্ছে এই পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের সহাবস্থান। 

একটি আধুনিক সমাজে পাঠক হলো সার্বভৌম সত্তা। কোনো বই তারা গ্রহণ করবে আর কোনটি প্রত্যাখ্যান করকে তা তাদের এখতিয়ারের বিষয়। ভিন্নমত, ভিন্নযুক্তি, ভিন্ন ভাষা অপরাধ নয়। বরং অভিব্যক্তি প্রকাশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল মানদণ্ডে ভিন্ন মত গ্রহণযোগ্য বিষয়। সমাজে চিন্তার স্বাধীনতা রুদ্ধ হলে সেই সমাজ অন্ধকার নেমে আসতে বাধ্য। 

যে অগ্রসর সমাজে একই বিষয় নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং তা অগ্রহণযোগ্য নয়। যেকোনো ধরনের সৃজনশীলতা ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব অর্জন, এর চর্চা ব্যক্তির অধিকার, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল মানদণ্ডে সুরক্ষিত। 

বাংলা একাডেমি তার বুকে যে স্লোগানটি ধারণ করে রয়েছে-''বাঙালির জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক'' তাকে সত্যি সত্যি আমলে নিতে হবে। চিন্তা ও মতের ভিন্নতা চর্চায় বাংলা একাডেমি হোক সহায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়। অমর একুশে বইমেলা হোক স্বমত, ভিন্ন মত, চিন্তা-সৃজনের উজ্জ্বল পরিক্ষেত্র। আর এটি নিশ্চিত করা গেলে অমর একুশের বইমেলার মর্মবাণীকে সমুন্নত থাকবে।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন