https://www.prothomalony.com/
8309
north-america
বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন সিলেট অঞ্চলের মানুষ। তাদের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক অনন্যতায় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এর আগে নিউইয়র্কে হয়ে গেছে বিশ্ব সিলেট সম্মেলন। এমন একটি সম্প্রীতি সম্মেলন হয়ে গেলো কলকাতায়। কলকাতা সিলেট উৎসব ২০২৪ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে যোধপুর পার্ক পূজা প্রাঙ্গণে। ২৭ ও ২৮ জানুয়ারী এ উৎসবে পূর্ব পশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা বিশিষ্ঠ সিলেটিরা যোগ দিয়েছেন।
'বিশ্ব সিলেট সম্মেলন' এর বর্তমান সভাপতি রাশেদা কে চৌধুরী, মহা সচিব কর্নেল(অবঃ) আব্দুস সালাম এবং প্রধান সমন্বয়কারী ও সংগঠনের সহ সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ। কলকাতার সিলেট উৎসবের জের ধরে ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁর সাথে আলাপচারিতার জের ধরে কিছু নেপথ্য কথা তুলে ধারা হলোঃ -
"সিলেট সম্মেলন অনেক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাখে। ১৮৭৫ সালে সিলেট জেলাকে বেঙ্গল প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সাথে সংযুক্ত করা হলে সিলেটিরা এর প্রতিবাদ করেন। এ প্রতিবাদে কোন লাভ হয়নি। আসামের সাথে সংযুক্তিতে সিলেটিদের লাভ ক্ষতি উভয়ই হয়েছিল। লাভ হয়েছিল, কারণ আসামবাসী কম পড়াশুনা করায় সিলেটিরা (বাঙালী) এই সুযোগ নিয়ে সব স্কুল কলেজে পড়াশুনা করেছে। সেই সময় ভারতে,বিশেষ করে আসাম রাজ্যে সব ক্ষেত্রে বড় ভুমিকা রাখেন এসব লোকজন। আসামের রাজনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার সিলেটিরা প্রতিপত্তি লাভ করেন। এমনকি শান্তিনিকেতনেও বেঙ্গল প্রদেশ থেকে বেশি আসামের সিলেটিরা প্রধান পদগুলিতে নিয়োগ পেয়েছেন। তাছাড়া আরেকটি লাভ হয়েছিল আসামবাসীর। বেঙ্গল খেদাও আন্দলনের বৈরী ভাবের চাপে সব সিলেটিরা হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এক জাতি হিসাবে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেন। অসাম্প্রদায়িক এক অপূর্ব পরিস্থিতি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে জুড়ে বিরাজমান হয়েছিল। তাছাড়া, সিলেটে অনেক বর্ণ হিন্দু থেকে মুসলিম হিসেবে ধর্মান্তরি হওয়ার ফলে দুই ধর্মের অনেকের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক সন্মানের সাথে বজায় রাখতে দেখা গেছে।
এসব ছাড়াও সুফী সাধক হজরত শাহজালাল(রহঃ) এবং বৈষ্ণব সাধক শ্রী চৈতন্যের প্রভাবে এ অঞ্চলের সব মানুষের মধ্যে একই স্রষ্ঠার মমতা ছড়িয়ে পড়ে। ভাতৃত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের এ বোধ যেন সিলেট অঞ্চলের আবহাওয়া ও সংস্কৃতির সাথে মিশে যায়। বাংলা থেকে নির্বাসিত সিলেটবাসী নিজেদের উন্নতির জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ডে এক সাথে এগিয়ে আসেন। সামাজিক , রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অসাম্প্রদায়িকতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে সিলেট অঞ্চলে বারবার। গ্রামে গঞ্জে সব বাউল আর ফকিরদের গানে ছিল অসাম্প্রদায়িকতা আর আর ভালোবাসার সুর।
.jpeg)
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাজা জিসি এবং সাধু বাবুর পরিবারের শিক্ষা ক্ষেত্র সহ অনেক ক্ষেত্রে দান ছিল অভাবনীয়। কুদরত উল্লাহ মসজিদের জন্য ১ টাকায় জমি প্রদান করেছিলেন তারা। মুরারী চাঁদ কলেজের সকল জমি অধিকরণ করে কলেজ ভবন নির্মান করেন, তখনকার আসামের শিক্ষামন্ত্রী সৈয়দ আবদুল মজীদ কাপ্তান মিয়া। কিন্তু তিনি নতুন বিরাট কলেজটিতে নিজের নাম না দিয়ে মুরারী চাঁদ কলেজ নাম করেন। মুরারী চাঁদ কলেজ তখন রাজার স্কুলের উপরে আর গোবিন্দ পার্কে বেহাল অবস্থায় ছিল।
সিলেট সম্মেলন শুরু হয়েছিল ১৯০২ সাল নাগাদ। তারা ঘরে বসে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ করে দেয়াসহ অনেক সামাজিক কাজে তৎপর ছিলেন। সমস্ত ভারতে ছিটিয়ে থাকা সিলেটিরা এই ঐতিহ্যকে গর্বের সাথে ধারণ করতেন এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতেন।
ভারত বিভাগের পর সিলেট সম্মেলন হতে লাগলো কলকাতা সহ বিভিন্ন রাজ্যে। এবারের সম্মেলন বা উৎসবের সুর ছিল বিশেষ করে সিলেটের গান ও আধ্যাত্মিকতা। এসবের ঐতিহ্যকে ভারতবাসীর কাছে তুলে ধরা আর নিজেদের মধ্যে মিলন মেলার মাধ্যমে প্রজন্ম ও নিজেদের একটি সন্মানের জায়গায় নিয়ে যাওয়া। আজ সমস্ত ভারতে সিলেটি গানের ব্যাপক পরিচিতি। পাকিস্তান বা পরে বাংলাদেশে সিলেট সম্মেলন করার দরকার মনে করা হয়নি। তবে দক্ষিন কলকাতা সিলেট এসোসিয়েশনের সভাপতি প্রদোষ এবং ডা দিপ্তার আকুল আমন্ত্রণে শুরু হয় নতুন করে সেতুবন্ধন। ঢাকার জালালাবাদ এসোসিয়েশন কলকাতায় প্রথমবারের মত ২০১৬ সালে তাদের সাথে যোগদান করেন। সেই বছরই বাংলাদেশের সিলেট ও ঢাকায় আন্তর্জাতিক সিলেট উৎসব করে সবাইকে অনুপ্রাণিত করেন।
সেই সময় বহু দুরে থাকা প্রবাসী সিলেটিদের ঐক্যবদ্ধ করে সিলেট বিভাগের উন্নতি করার চিন্তা মাথায় আসে। এ নিয়ে ডাঃ জিয়াউদদীন আহমেদ ও সমাজ সংগঠক জুয়েল চৌধুরী, নিউইয়র্কে প্রথম বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের আয়োজনে ভূমিকা রাখেন।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র জালালাবাদ এসোসিয়েশনের ব্যানারে ও নেতৃত্বে বিশাল আকারে, সাত হাজারের বেশি মানুষের উপস্থিতিতে এ সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। সেবারের সম্মেলন শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একটি অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে পুরো অঞ্চলের নানা বিষয়ের উন্নয়ন ধারনার একটি মডেল সঞ্চারিত করার চেষ্ঠা করা হয়েছিল। নয়টি পৃথক সেমিনারে আমেরিকার সবচেয়ে নাম করা বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ি, সাংবাদিকসহ বহু মানুষ এতে অংশ গ্রহন করেন। স্যার ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন প্রধান অতিথি। চার জন বিশেষ অতিথির মধ্যে ছিলেন মেজর জানারেল সি আর দত্ত , বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডা কালি প্রদীপ চৌধুরী, বিচারপতি এস কে সিনহা এবং সিলেটের নারী শিক্ষার অগ্রদূত অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমেদ।
চলমান বিভাজনের বৈরী সময়ে অসাম্প্রাদায়ীক ঐতিহ্যের দৃষ্ঠান্ত স্থাপিত হয়। দুই ধর্মের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধকে উন্নত করার জন্য তিনজন হিন্দু এবং সংখ্যা লঘু সম্প্রদায় থেকে বিশেষ অতিথি হিসাবে সন্মানিত করা হয়। এরপর থেকে বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের সাথে সিলেটকে উন্নত করার জন্য বিভিন্নজন এগিয়ে আসেন।
কানাডায় দেবব্রত দে তমালের নেতৃত্বে টরোন্টো জালালবাদ এসোসিয়েশন বিশাল এবং সুশৃংখল বিশ্ব সম্মেলন করে এর প্রতিশ্রুতি এগিয়ে যায়। পরে কোভিডের সময় জুমে দশ দিন ব্যপী সিলেট সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আসামের সিলেটি সহ পৃথিবীর সব এলাকা থেকে সিলেটিরা অংশগ্রহণ করেন। অব্যাহত সিলেটি সম্মেলন আন্দোলন এক সময় আরো সংঘটিত হবে এবং সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে সিলেট সম্মেলনের সাথে সম্পৃক্তরা মনে করেন।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন