https://www.prothomalony.com/

8101

north-america

উত্তর আমেরিকা

বিবিসির বিশ্লেষণ : আ’লীগের জয় কেন ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারী ২০২৪ ০৪:৪৯

c নভেম্বর মাসে ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের সচিব যেদিন ঘোষণা করে দিলেন, দিল্লিতে এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সচিবদের সামনে নিজেদের স্পষ্ট অবস্থান জোরালেভাবে তুলে ধরেছে যে বাংলাদেশের মানুষই স্থির করবে নির্বাচন কিভাবে হবে। তখনই ভারতের অবস্থানটা বোঝা গিয়েছিল যে তারা তাদের চিরাচরিত মিত্রের পেছনেই দাঁড়াচ্ছে।

তাই আওয়ামী লীগ বিপুল আসনে জয়ী হওয়ার পরে প্রথম যে কয়েকজন রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের ফোন আসবে ঢাকায়, তাদের মধ্যে যে নরেন্দ্র মোদির নাম থাকবে, সেটা আশ্চর্যের কিছু নয়।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার পরে মোদি তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বললাম এবং সংসদ নির্বাচনে টানা চতুর্থবারের মতো ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করায় তাকে অভিনন্দন জানালাম।’

বাংলাদেশের সাথে চলমান অংশীদারিত্ব আরো দৃঢ় করার বার্তাও দিয়েছেন মোদি।

বাংলাদেশে স্থিতিশীল সরকার চায় ভারত

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে সবসময়েই ভারত স্বস্তিতে থাকে। ভারত আর আওয়ামী লীগের মধ্যে সুসম্পর্ক যেমন ঐতিহাসিকভাবে থেকেছে, তেমনই শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার গত দেড় দশকে তা আরো দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বিনা সিক্রি বলছিলেন, ‘দু’দেশের সম্পর্কের মধ্যে যদি একটা ধারাবাহিকতা থাকে তাহলে অংশীদারিত্ব জোরদার হয়। আর ভারত সবসময়েই চাইবে যে প্রতিবেশী দেশগুলোতে একটা স্থিতিশীল সরকার থাকুক। এর ফলে কূটনৈতিক সম্পর্ক বলুন বা বাণিজ্য অথবা যৌথ প্রকল্পগুলো- সবক্ষেত্রেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে সুবিধা হয়। শেখ হাসিনা আবারো জিতে আসাটা দু’দেশই লাভবান হবে, এমন অনেকগুলো যৌথ প্রকল্প তো চলছে, তাই ভারতের দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

সেই বার্তাটাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিয়েছেন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরেই।

বিনা সিক্রির কথায়, নির্বাচনের এই ফলাফল ভারতের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বড় বিষয় হলো যে ‘বাংলাদেশের মানুষই তো ভোট দিয়ে শেখ হাসিনাকে আবারো ফিরিয়ে এনেছেন।’

এই প্রসঙ্গে তার কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় যে ভোটদানের হার তো বেশ কমই ছিল। বিনা সিক্রি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে বিপুল হারে ভোট পড়েছে তা বলব না। কিন্তু বহু দেশেই এরকম অথবা আরো কম হারে ভোট পড়ে থাকে। তাই এটা অস্বাভাবিক কিছু বলে আমি মনে করি না।’

উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ

ভারতের উত্তর-পূর্বের বেশিরভাগ রাজ্যের সাথেই বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে। এই অঞ্চলে একসময়ে আসামের আলফা বা ত্রিপুরার সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মতো অনেক সংগঠনই বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়েছিল বলে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করত, কিন্তু বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সরকার তা মানতে চাইত না।

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ২০০৭ সালে উত্তর-পূর্ব ভারতের ১১২ জন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা-নেত্রীর একটি তালিকা তুলে দিয়েছিল বাংলাদেশের হাতে, যারা ওই সময়ে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। আরেকটি পৃথক তালিকা দেয়া হয়েছিল বিএসএফের পক্ষ থেকে, যেখানে ১৭২টি শিবিরের উল্লেখ ছিল, যেগুলো উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো পরিচালনা করে বলে বিএসএফ দাবি করেছিল।

আবার মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুরনো শিবিরগুলোতে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা (আইএসআই) যাতায়াত করছে আর তাদের মধ্যে থেকে নিয়োগের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, এমন একটি তালিকাও বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেছিলেন, নির্দিষ্ট কোঅর্ডিনেট দিয়ে বাংলাদেশের এক প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে যে কোথায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে গুপ্তচর নিয়োগের চেষ্টা চালাচ্ছে আইএসআই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, আগে ভারতের পক্ষ থেকে বার বার এই বিষয়গুলো তোলা হলেও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কিন্তু ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

ভারতের এলিট কম্যান্ডো বাহিনীর (এনএসজি) অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক দিপাঞ্জন চক্রবর্তি বলছিলেন, ‘উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আর উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর যেসব তৎপরতা একসময়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে চলত, সেসব তো শেখ হাসিনা বন্ধ করেছিলেনই, আর সেই অবস্থাটা বজায় রাখার জন্য শেখ হাসিনার নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসা খুবই জরুরি ছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়াও নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে ভারতে, সেটা বন্ধ করতে হলেও শেখ হাসিনার সহযোগিতা প্রয়োজন ভারতের। তাই তার নির্বাচনে জিতে ফিরে আসাটা ভারতকে নিরাপত্তা প্রসঙ্গে নিশ্চিতভাবেই অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে।’

বিএনপি-ছাড়া নির্বাচন

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বিনা সিক্রি বলছিলেন, বাংলাদেশের দ্বাদশ নির্বাচনে যে সব থেকে বড় বিরোধী দল বিএনপি যোগদান করেনি, সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এর জন্য নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না।

তার কথায়, ‘একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনে কোনো দল অংশ নেবে কি-না সেটা সম্পূর্ণভাবেই তাদের সিদ্ধান্ত। যদিও আমি মনে করি, নির্বাচনে সবদলেরই অংশ নেয়া উচিত। কিন্তু বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা যোগ দেবে না, যতক্ষণ শেখ হাসিনা সরকারে থাকবেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টিই তো বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। যে বিষয়টা বাংলাদেশের সংবিধানেই নেই, সেটা কী করে কেউ দাবি করতে পারে?’

তিনি বলেন, ‘তবে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলেও তাদের দলের ৩০ জনের মতো নেতা তো প্রার্থী হয়েছিলেন! আসলে আমার মনে হয় বেগম খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ, তারেক রহমানও বাইরে থাকেন। তাই দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মনোভাব ঠিক কতটা ধরতে পেরেছিলেন, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’

চীন প্রসঙ্গ ও বাংলাদেশের নির্বাচন

দ্বি-পক্ষীয় প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে বা দ্বি-পক্ষীয় সমস্যার সমাধানে ধারাবাহিকতা থাকা যেমন দরকার ভারতের স্বার্থেই দরকার, তেমনই ভারত আর বাংলাদেশের দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্ককে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট থেকেও বিচার করা দরকার বলে মনে করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত দুই হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশে সব থেকে বড় সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে উঠে এসেছে বেইজিং। চীনা ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ তাদের বড় বড় বেশ কয়েকটি প্রকল্প সম্পূর্ণ করতে পেরেছে। এছাড়াও কয়েক ডজন মহাসড়ক, ২১টি সেতু আর ২৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চীন জড়িত রয়েছে।’

বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ ছাড়াও বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তাও দিয়ে থাকে চীন।

কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসুরায় চৌধুরী বলছিলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশে যেভাবে চীনের উপস্থিতি বেড়েছে, যেভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এসেছে বাংলাদেশে, সেদিক থেকে দেখলে চীন সেখানে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী। চতুর্থবার ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনার সরকারের আমলে চীনা সহায়তাকে ঘিরে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত কতটা তার মোকাবিলা করতে পারে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

বাংলাদেশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ দরকার

নির্বাচনের আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষের একাংশের মধ্যে একটা ভারতবিরোধী ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে খোলাখুলিই লিখেছে যে ভারতের ইচ্ছা বলেই নির্বাচন নিয়ে অনড় অবস্থান নিয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছেন শেখ হাসিনা।

অবশ্য এই ক্ষোভ এবারের নির্বাচনের আগে যে নতুন করে দেখা যাচ্ছে, তা নয়। বিগত নির্বাচনগুলোর আগে-পরে, ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের একাংশের মানুষকে বিষোদ্গার করতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

অধ্যাপক সব্যসাচী বসুরায় চৌধুরী বলছেন, কোনো দেশের সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের একাংশের ক্ষোভ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, সেগুলো সময় মতো যদি রক্ষিত না হয়, তা হলে জটিলতা তো দেখা দেবেই। বাংলাদেশের মানুষের মনে তখনই প্রশ্ন ওঠা অসঙ্গত নয় যে ভারত-বাংলাদেশের দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্কের ফলে তারা কতটা লাভবান হলেন বা হতে পারেন। এই প্রশ্নও তাদের মনে ওঠা স্বাভাবিক যে আদৌ তারা লাভবান হবেন তো? বাংলাদেশের মানুষের একাংশের মনে সেই প্রশ্ন যেন না ওঠে, তার জন্য ভারতকে আরো সদর্থক ভূমিকা নিতে হবে। এইসব প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে একটা বড় বিষয় তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করা।’

সূত্র : বিবিসি

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন