https://www.prothomalony.com/
7969
opinion
বিশ্বজুড়ে মানুষ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতরাচ্ছে। শিশুরা পথে শীতের রাতে কুকুরের পাশাপাশি। কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী তাদের দায়িত্ব নিবে না। কারণ ওরা তাদের কেউ নয়, ওরা গরিব। গরিব মানেই অসহায়, অনাকাঙ্ক্ষিত। ওদের কেউ নেই, ওদের কিছু নেই। "মানুষ মানুষের জন্যে/ জীবন জীবনের জন্যে/ একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?/ ও বন্ধু....মানুষ মানুষের জন্যে....."- ভূপেন হাজারিকার কথাগুলো কি ফেলে দেয়া যায়? নাহ, যায় না। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এখনো কেউ আছেন, কিছু একটা আছে যা মানবতার সংজ্ঞাকে নতুন করে রূপ দিয়ে যায়।
দম্পত্তি জামিল চৌধুরী ও বেগম রোকেয়া চৌধুরী-সেইজন, যারা ভূপেন হাজারিকার বাক্যকে বাস্তবায়িত করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। "বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি (Bangladesh Female Academy-BFA) এর প্রতিষ্ঠাতা জামিল চৌধুরী এবং বেগম রোকেয়া চৌধুরী। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জনকল্যাণ সংসদ (GJKS) দিরাই এর প্রতিষ্ঠাতা জামিল চৌধুরী ও বেগম রোকেয়া চৌধুরীর উদ্যোগে ও নিজস্ব ফান্ডে, বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি(BFA) দিরাই সুনামগঞ্জ, দিরাই পৌরসভায় মেইন রোডে, ১৯৮০ সালে তাদের নিজস্ব ফান্ড দিয়ে ৮ একর জায়গা খরিদ শুরু করেন। ২০০২ সালে নিজস্ব ফান্ড দিয়ে দুই/তিন তলা ভবন নির্মাণ করেন। ২০০৬ সালে মাত্র তিনটি ক্লাস দিয়ে, ৬ এপ্রিল, ৯০জন ছাত্রী ভর্তি করানো হয়। ৭০ জন দেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ৪ জন ভিনদেশি সহ বিভিন্ন জনের কাছ থেকে কিছু সহযোগিতা নিয়ে, তিনটি ক্লাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ১ম শ্রেণি, কলেজ, নার্সিং কোর্সগুলো চালু করেন। এভাবেই মানবকল্যাণে এই দম্পত্তির যাত্রা শুরু।
.jpeg)
বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি-সমন্বিত শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে এবং দেশের উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করতে দৃষ্টি নিবন্ধ করে। এর লক্ষ্য হলো-দরিদ্র, এতিম, অবহেলিত, বঞ্চিত মেধাবী ছাত্রীদের তথ্য প্রযুক্তি ও ধর্মীয় শিক্ষায় উন্নত করা এবং শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। এছাড়াও, ছাত্রীদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক মান উন্নয়ন করা, শিক্ষার্থীরা স্বনির্ভর হয়ে যেন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া, তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, উচ্চশিক্ষার সুযোগের পাশাপাশি দেশবিদেশে মেয়েদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, নেভি, ল্যান্ড এয়ার ফোর্স, নার্সিং, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইত্যাদিতে চাকরি দেওয়ার চেষ্টা করা এবং তাদের জ্ঞানীয় বিকাশে দক্ষ হতে সহায়তা করা যেন তারা সফলভাবে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে এবং পরিবার বজায় রাখতে পারে-এই লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে 'বাংলাদেশ ফিমেল একাডেমি।'
বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি-ধর্ম, বর্ণ, বৈষম্য এড়িয়ে সকল স্তরের অসহায় দরিদ্র, অটিস্টিক, অক্ষমতার সাথে বাস করা এবং এতিম-গৃহহীন মেয়েদের জন্য দেশের একমাত্র বিনামূল্যে আবাসিক একটি বেসরকারি সমন্বিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশে প্রায় ২৩ লক্ষ অবহেলিত মেয়ে-শিশুরা এই অবস্থানে রয়েছে, এদের অধিকাংশই কারো বাসাবাড়িতে ঝি চাকরানি বা আয়া বুয়া সহ বিভিন্ন জায়গায় থাকছে। এদের পরিবারের কেউ সমাজে উন্নত জীবনযাপন করতে পারে না। কিছু সরকারি বেসরকারি এতিমখানা দেশে থাকলেও তা খুবই সামান্য পরিমাণে। তাছাড়া এখানে উন্নত লেখাপড়া, খাবার ও পোশাক এবং পরিবেশ সহায়ক নয়। যেহেতু এসকল বঞ্চিত মেয়েদের জন্য দেশে আর কোন সুযোগ নেই, তাই বাংলাদেশ ফিমেল একাডেমি(BFA) স্কুল কলেজ সম্পূর্ণ ফ্রি-তে আবাসিক এই সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করেছে, যার মাধ্যমে একটি মডেল হিসেবে BFA দেশবিদেশে বহু আগেই সুপরিচিতি অর্জন করেছে এবং সকল ধর্মের জন্য পৃথক ব্যবস্থা নিয়ে একত্রে কাজ করে যাচ্ছে।
জামিল চৌধুরী জানান, বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি'র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৭৪ জন সহ তাঁর পরিবারের ছেলে-মেয়ে, জামাই, ছেলের বৌ সহ মোট ১০৫ জন সদস্য নিয়ে সাধারণ কমিটি গঠিত। ১১ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে। তিনি জানান, এই প্রতিষ্ঠান থেকে মেয়েরা লেখাপড়া, খাওয়া থাকা এবং কাপড়, জুতা-মোজা, বিছানা-বালিশ সবই ফ্রিতে পায়। এপর্যন্ত প্রায় এক হাজার মেয়ে লেখাপড়া শেষ করেছে এখানে এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। অনেকেই দেশে-বিদেশে চাকরি করছে। বর্তমানে ৬৭২ জন ছাত্রী ও ২৯ জন স্টাফ নিয়ে সম্মানের সহিত 'বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি' তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি-যেহেতু ব্যতিক্রমী গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল একটি উদ্যোগ, তাই প্রথম থেকেই সরকারি বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এটি এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে, সরকারি চাল, ভবন নির্মাণ, সরকারি ফ্রি কোটা(মেডিকেলে)। জামিল চৌধুরী বলেন, "সরকারি বিভিন্ন বিভাগের সহায়তায় আমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তায় আমাদের প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত করতে সরকারি তিনটি বড়ো ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরও তিনটি নতুন ভবন এখন নির্মাণাধীন।উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, অর্থ, সমাজকল্যাণ,মহিলা ও শিশু বিষয় মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। আমি তাদের এ অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ।"
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জামিল চোধুরী বলেন, "এখানে বিএসসি নার্সিং, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি ট্রেনিং সেন্টার সহ প্রধানমন্ত্রীর দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছিলেন। মাননীয় সচিব ও মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী মহোদয় এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলোর সাহায্যে একসাথে কাজ করে যাচ্ছি। ১৮-৪৫ বছর বয়সের মেয়েদের জন্য দেশের উন্নয়ন সেবামূলক কার্যক্রমে অপূর্ব সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করার জন্য সরকার অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন এবং ৩০ কোটি টাকা দিয়ে ২টি নতুন ভবন নির্মাণ করায়, আগামী মাসেই দক্ষ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে 'বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি' সুপরিচিতি লাভ করবে ইনশাআল্লাহ্! "
.jpeg)
তিনি আরো বলেন, "বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমি' দিরাই সুনামগঞ্জ এর এখন মূল সহায়তার আবেদন হচ্ছে,
১.ছাত্রী স্পনসরকারী, ২.মাসিক বেতনের সহায়তাকারী, ৩.মেয়েদের খাদ্যের সরবরাহ সহায়তা করা, ৪. পোশাক, বইপুস্তক, ট্রেনিং ইকুইপমেন্ট দিয়ে সহায়তা করা, ৫.রমজান ও কোরবানি কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করা। দেশের ২৩ লক্ষ অসহায় এতিম গৃহহীন অটিস্টিক মেয়েদেরকে শিক্ষা উন্নয়ন সেবামূলক কার্যক্রমে সবাইকে জড়িত করতে হলে, শুধু আমাদের এক প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্ভব নয়, সুতরাং দেশের প্রত্যেক জেলা উপজেলা সদরে একটি করে প্রতিষ্ঠান তৈরি করা জরুরি। আহ্বান জানাচ্ছি, সরকারি সহযোগিতাসহ বিশিষ্ট সমাজসেবক দানশীল দয়াবান ব্যক্তিগণকে। এক্ষেত্রে সাংবাদিক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সহযোগিতাও প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিয়ে এই বঞ্চিত মেয়েদের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব।"
প্রতিষ্ঠানটির আরো উন্নতি করতে এবং দেশের সাথে জড়িত করতে দেশি-বিদেশি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের 'বাংলাদেশ ফিমেল একাডেমি'তে ভিজিট করতে আমন্ত্রণ জানান তিনি। জামিল চৌধুরী দীর্ঘ সময় ধরে একনিষ্ঠতা ও দায়দায়িত্ব নিয়ে মেয়ে শিশুদের আবাসিক স্কুলকলেজ গড়তে সক্ষম হয়েছেন। ছাত্রীরা পড়াশোনায় ভালো ফলাফল তুলছে, স্বনির্ভর হয়ে উঠছে, জীবনযাপনের ধরন পাল্টাতে পারছে। দেশে বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। 'বাংলাদেশ ফিমেল একাডেমি'র প্রচেষ্টা না থাকলে এই মেয়ে শিশুগুলোর হয়ত সুযোগ সুবিধার অভাবে কোথায় কাজের মেয়ে হিসেবেই জীবনযাপন করতে হতো। এ এক বিরাট সাফল্য 'বাংলাদেশ ফিমেল একাডেমি'র। এ এক বিরাট সাফল্য দম্পতি জামিল চৌধুরী ও বেগম রোকেয়া চৌধুরীর। এ প্রসঙ্গে জামিল চৌধুরী, এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞা জ্ঞাপন করেন।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন