https://www.prothomalony.com/

7931

north-america

উত্তর আমেরিকা

ইউনাইটেড হিন্দুস্ অব ইউএসএ এর সংবাদ সম্মেলন

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৬:২০

ইউনাইটেড হিন্দুস্ অব ইউএসএ এর আয়োজনে বাংলাদেশে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হিন্দুদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান বিষয় নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর শুক্রবার জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন রেষ্টুরেন্টে সন্ধ্যা ৬ টায় অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলন ইউনাইটেড হিন্দুস্ অব ইউএসএ এর পক্ষ থেকে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। 

বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচন আসন্ন। নির্বাচন উপলক্ষ্যে দেশে যে অস্থিরতা বিরাজমান, এর সুযোগ নিয়ে ২০০১ সালের অক্টোবর কিংবা ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে বর্বর সহিংসতা চালানো হয়েছিল তার সম্ভাব্য পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। দেশে এখন অগ্নি সন্ত্রাস চলছে। ট্রেনে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, এমনকি একজন পুলিশ অফিসারকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিরোধী দল এবং তাঁদের সমমনা দলগুলো নির্বাচন বয়কট করে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে হিন্দুরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চাইলে তাঁদের উপর ২০০১ সালের মত অত্যাচার চালানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। হিন্দুদের উপর সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ঠেকানো এবং কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে দ্রুত গতিতে সেটা মোকাবেলা করার মত যথেষ্ট  ক্ষমতা যে প্রশাসনের নেই সেটা আমরা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। আমরা অনেকটাই আশ্বস্ত হয়েছি যে সেনাবাহিনী কিছুদিন অন্তত: মাঠে থাকবে, কিন্তু আপনাদের মাধ্যমে আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ সকল রাজনৈতিক দলের কাছে অনুরোধ জানাতে চাই যে, নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে হিন্দুদের সুরক্ষার জন্য সেনাবহিনীকে মেজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হোক, এবং বি.জি.বি. ও র‌্যাব বাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হোক।

বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডে হিন্দু নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের এবং এর হোতারা একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী - তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী, মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি, যারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহাবস্থানে বিশ্বাস করে না, নারী-পুরুষের সম-অধিকার, নারীর শিক্ষা ও কর্মের অধিকার, শিল্পকলা, সঙ্গীত, গণতন্ত্র, অর্থাৎ আধুনিক মানব সমাজের যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন তার কিছুতেই বিশ্বাস করে না। ঐ বর্বর গোষ্ঠী,  ১৯৪৬ সালের  ১০ই অক্টেবর  নোয়াখালী ম্যাসাকার দিয়ে এই ভুখন্ডে হিন্দু নির্যাতনের সূত্রপাত করেছিল, তারপর ১৯৫০-এ ভৈরব ব্রীজ ম্যাসাকার, ১৯৬৪ সালের ম্যাসাকার, ১৯৭১ সালের গণহত্যা, ধর্ষণ, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ, দেব-দেবীর মূর্তি ও দেবালয় ধ্বংস করেছিল তো বটেই,  এমন কি সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক বাংলাদেশেও তারা তাদের সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ধারা বজায় রেখেছে। 

বাংলাদেশ আমলে ১৯৭২ সালের অক্টেবরে পূজা মন্ডপ ও দেবীর প্রতিমা ধ্বংস করা দিয়ে হিন্দু নির্যাতনের সূচনা করে বর্বররা। পরবর্তীতে নিয়মিতভাবে হিন্দু নির্যাতন করে এসেছে অসংখ্যবার।  রামু, নন্দীরহাট, নাসিরনগর, সুনামগঞ্জ, সাঁথিয়া, বোরহানউদ্দীর, ঠাকুরগাঁও প্রভৃতি জায়গার ঘটনা এবং ২০২১ সালের পুজোয় নানুয়ার দিঘীর পাড় থেকে শুরু করে দেশের ২২টি জেলায় যুগপৎ হিন্দু নির্যাতনের ভয়াবহ ঘটনা এর অন্তর্ভূক্ত। ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ বাঙালীর প্রান, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম, এবং অত্যাচারের মুখে ৯০ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সেকুলার ডেমোক্র্যাটিক বাংলাদেশেও হিন্দু নির্যাতনের এই  নিষ্ঠুর  প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে সেটা ছিল অকল্পনীয়। অথচ বাস্তবে সেটাই ঘটে চলেছে।
 
১৯৭২ সাল থেকে এ’ পর্যন্ত এক দিকে হিন্দুদের প্রতি প্রতিটি সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ আর অন্য দিকে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী, মৌলবাদী, ও উগ্রপন্থীদের মধ্যযুগীয় অত্যাচারের ফলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু দেশত্যাগ করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে ভারতে, যেখানে তারা অবৈধ, পরিচয়হীন মানুষ হিসাবে আত্মগোপন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
 
বৈষম্যের উদাহরণ যদি জানতে চান তো ধরুন, ১৯৭২ সালে পাকিস্তানী আমলের শত্রু সম্পত্তি আইনকে  বহাল রেখে হিন্দুদের কাছ থেকে প্রায় ২.৮ মিলিয়ন একর জমি অধিগ্রহন করে নিয়েছে সরকার। ১৯৭৪ সালে ইসলামী ফাউন্ডেশন করা হয়েছে, কিন্তু হিন্দু ফাউন্ডেশন করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত রমনা কলিবাড়ি পুনর্নিমানে সাহায্য করা তো দূরের কথা সেখানে যুগের পর যুগ হিন্দুদের  প্রবেশাধিকারও দেওয়া হয়নি। একইভাবে বর্তমানে দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণের কাজ প্রায় সম্পন্ন, কিন্তু একটি মন্দিরও নির্মাণ করা হয়নি।  তাছাড়া বি.এন.পি., জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ সকলে মিলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে আমাদের ভাই বোন ও বন্ধু-বান্ধবদের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিণত করেছে। আর নির্যাতনে সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা যদি জানতে চান, তাহলে ধরুণ লোগাং ম্যাসাকারের কথা - বি.এন.পি. সরকার তো সরাসরি বি.ডি.আর. পাঠিয়ে আবাদীদের সঙ্গে মিলে ১৯৯২ সালের ১০ই এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামে লোগাং এ আদিবাসীদের গণহত্যা করে পুরো গ্রামটিকে বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, যে ঘটনার নিন্দা করে ১৭ জন ইউ.এস. কংগ্রেসম্যান সে বছরের ১৭ই নভেম্বর তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিঠি লিখেছিলেন। আর ২০০১ সালের অক্টোবরের  নির্বাচনে জেতার পর বি.এন.পি. এবং জামাত যৌথভাবে এক রাতে ভোলার চর ফ্যাশনে এক স্পটে ২০০ হিন্দু মেয়েকে ধর্ষণ করেছিল সেই সময় ধর্ষিতাদের মধ্যে হিন্দু মেয়ের হার ছিল ৯৭% (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০০২)। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা হিন্দু-প্রধান গ্রামগুলো আগুনে পুড়ে হিন্দুদের উচ্ছেদ করেছিল যা গার্ডিয়ান পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল। সন্ত্রসীরা বাঁশখালিতে শীল পরিবারের ১১ জনকে জ্যান্ত পুড়ে মেরেছিল বলতে গেলে পুলিশের চোখের সামনে, সেসব হৃদয় বিদারক ঘটনা ডেইল স্টার, জনকন্ঠ, ভোরের কাগজ, বাংলাদেশ অভজারভার, দি ইকনোমিষ্ট  প্রভৃতি পত্রিকায় তখন নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।    
 
অত্যাচারের মুখে দেশত্যাগ এবং ছলে-বলে ধর্মান্তরিত করার ফলে দেশে হিন্দুর সংখ্যা যেখানে ১৯৯৮ সালে ছিল মোট জনসংখ্যার ১৬% সেখানে বর্তমানে সেটা নেমে এসছে ৭.৯৫%-এ (বাংলাদেশ সেন্সাস রিপোর্ট, ২০২২)। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের হার যে স্থলে ব্রটিশ আমলে ছিল ৯৮ শতাংশ, বর্তমানে সেটা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।  প্রফেসর আবুল বারাকাতের ভবিষৎ বাণী হল “তিরিশ বছর পর বাংলাদেশে কোন হিন্দু থাকবে না (ঢাকা ট্রিবিউন, ২০শে নভেম্বর, ২০১৬)”। পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু সংখ্যালঘু মুসলমানদের জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বের হারের গ্রাফটা আমাদের ঠিক বিপরীত। বাংলাদেশে হিন্দুদের বিলুপ্তি ঠেকাতে হলে, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় এনে দমন করতে হবে।
    
আওয়ামীলীগ তার ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়াদা করেছিল, নির্বাচনে জিতলে তারা একটি সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করবে এবং একটি সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করবে, কিন্তু বিগত পাঁচ বছরে সেই প্রতিশ্রুতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জন নেত্রী শেখ হাসিনা রক্ষা করেননি। ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে একই প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে। 

২০১৮ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংখ্যালঘু কমিশন এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন বিলটি পাশ করা হলে ২০২১ সালের পুজোয় সন্ত্রাসী হামলা হতো না আর আজ আমাদের এমন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকতে হত না। বাংলাদেশে সন্ত্রাসের মাধ্যমে আমাদের ভাইবোনদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে, সেটা  আমরা নীরবে মেনে নেব না। এটা ঠেকাতেই হেবে। বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে আমরা ইউনাইটেড হিন্দুস্ অব ইউএসএ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশন বরারব নিন্মলিখিত সুপারিশ মালা বাস্তাবায়নের জন্য পেশ করছি - 

১) আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে হিন্দুদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। 
২) ঝুকিপুর্ণ এলাকাগুলিতে প্রয়োজনে পুলিশ বিডিআর এবং সামরিক বাহিনী নিযুক্ত করতে হবে।
৩) সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বুলেটিন রেডিও টেলিভিশনে প্রচার করতে হবে।
৪) ধর্ম অবমাননার নামে হিন্দুদের বিরুদ্ধে আইসিটি অ্যাক্ট ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। 
৫)  যুক্তরাষ্টের মত হেইট ক্রাইম ও স্পীচ আইন অন্তভূক্ত করে একটি কঠোর সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাশ করে অবিলম্বে জজ সাহাবুদ্দীন কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত সংখ্যালঘু নির্যাতকদের বিচার আওতায় আনতে হবে।
৬) অবিলম্বে সংখ্যালঘু মন্ত্রনালয় গঠন করতে হবে।

বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষার এ সংগ্রামে আমরা আপনাদের পাশে পাব বলে আশ করছি।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন