https://www.prothomalony.com/

7530

opinion

অভিমত

'প্রতিবন্ধী দিবস' না বলে 'ব্যক্তির অক্ষমতা দিবস' বলুন

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:৫১

৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক 'পার্সনস্ উইথ ডিসএবিলিটি ডে।' বাংলায় আমরা একে 'ব্যক্তির অক্ষমতা দিবস' বলতে পারি। আমেরিকাতে 'Disable person' এর পরিবর্তে 'persons with disability' বলা হয়। এই দিনে ডব্লিউএইচও বিশ্বব্যাপী অংশীদারদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে প্রতিবন্ধকতায় থাকা ব্যক্তিদের এবং তাদের দ্বারা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কাজ করতে বিশ্বব্যাপী আহ্বান জানায়। 

১৯৯২-সালে ইউনাইটেড ন্যাশন জেনারেল অ্যাসেম্বলি  রেজোলিউশন ৪৭/৩ দ্বারা প্রতিবন্ধকতায় থাকা ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবসের বার্ষিক উদযাপন ঘোষণা করা হয়েছিল। দিবসটি পালনের লক্ষ্য হলো-প্রতিবন্ধকতা বিষয় সম্পর্কে বোঝাপড়ার প্রচার করা এবং প্রতিবন্ধকতায় থাকা ব্যক্তিদের মর্যাদা, অধিকার এবং মঙ্গলের জন্য সমর্থন জোগাড় করা। এটি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতায় থাকা ব্যক্তিদের একীকরণ থেকে প্রাপ্ত লাভের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে প্রতিবন্ধকতায় থাকা ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবস পালনের মূল কর্মসূচির মধ্যে থাকে উদ্বোধনী, প্যানেল আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধকতায় থাকা  ব্যক্তিদের অধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি সচেতনতা বাড়াতে এবং প্রচারের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপনের জন্য সদস্য রাষ্ট্র, সুশীল সমাজ সংস্থা এবং বেসরকারি খাতকে তাদের নিজস্ব অনুষ্ঠান আয়োজনে স্বাগত জানানো হয়। 

আমরা কেন 'প্রতিবন্ধী দিবস' না বলে 'ব্যক্তির অক্ষমতা দিবস' বলব? 

"প্রতিবন্ধী ব্যক্তি" মানে-শুরুতেই ব্যক্তির অক্ষমতা বর্ণণা করা। পরিবর্তে "ব্যক্তির অক্ষমতা দিবস" বললে, প্রথমে একটি অক্ষমতা বর্ণনা করার পরিবর্তে ব্যক্তি এবং তার পরিচয়ের উপর জোর দেয়া হয়। সিডিসি'র তথ্য মতে,  অক্ষমতা হলো শরীর বা মনের এমন একটি অবস্থা যা এই অবস্থায় থাকা ব্যক্তির পক্ষে নির্দিষ্ট কার্যকলাপ করা এবং তার চারপাশের বিশ্বের সাথে যোগাযোগ করা কঠিন করে তোলে। আর একটি অদৃশ্য অক্ষমতা হলো, শারীরিক, মানসিক, বা স্নায়বিক এমন একটি অবস্থা যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান না হলেও একজন ব্যক্তির নড়াচড়া, ইন্দ্রিয় বা কার্যকলাপকে সীমিত করতে পারে। অক্ষমতা তিনটি মাত্রায় আসে, দুর্বলতা (Impairment), কার্যকলাপের সীমাবদ্ধতা(activity limitation) এবং অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা(participation restrictions)। 

অক্ষমতা প্রগতিশীল, স্থির এবং বিরতিহীন হতে পারে। একটি অক্ষমতার অবস্থা কখনো সময়ের সাথে চিকিৎসা যত্নে উন্নত হতে পারে বা পরিবর্তন হতে পারে। স্বাস্থ্য বৈষম্য কখনো ব্যক্তির ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে বা অক্ষমতার দিকে ধাবিত  করতে পারে। ১.৩ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ আজ উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা বা অক্ষমতার সম্মুখীন, যা বিশ্ব জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ। আমেরিকার জনসংখ্যায় তা ২৬ শতাংশ। অনেক অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি সময়ের আগেই মারা যান, অনেকে বিভিন্ন স্বাস্থ্য অবস্থার বিকাশের ঝুঁকিতে থাকেন। অনেকেই পরিবার ও সমাজে গ্রহণযোগ্য হোন না, আবার অনেকেই অন্যান্য জনসংখ্যার তুলনায় দৈনন্দিন কাজকর্মে সীমাবদ্ধতায় পড়েন। এটাকে "স্বাস্থ্য বৈষম্য" বলা যেতে পারে, কারণ এগুলি মূলত পরিহারযোগ্য এবং স্বাস্থ্য খাতের অভ্যন্তরে এবং বাইরে অন্যায়মূলক কারণগুলির দ্বারা চালিত। এই কারণগুলির মধ্যে রয়েছে, আমাদের সমাজে বৈষম্য, অসাম্য নীতি, স্বাস্থ্যের নির্ধারক, চিকিৎসা ও যত্নের অভাব, এবং পরিবার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নেতিবাচক মনোভাব। এই স্বাস্থ্য বৈষম্যের কারণেই ‌অনেক প্রতিবন্ধকতা বা অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা প্রায়শই পিছনে পড়ে থাকেন।কাজেই ব্যক্তির অক্ষমতাকে "প্রতিবন্ধী ব্যক্তি" বলে পার্মানেন্ট লেভেল লাগানোর কোনো কারণ নেই। 

যখন কোনো প্রতিবন্ধকতা বা অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তির সাথে আমাদের দেখা হয় বা কথা বলতে যাই, তখন কিছু ভুল আমরা করে বসি। আমরা অনেক সময় সহমর্মিতা প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কিছু বলে ফেলি যেখানে শ্রদ্ধা ও ভদ্রতার ঘাটতি থাকে। কিছু উদাহরণ ও ব্যাখ্যা হলো-

(১) আপনার কি সমস্যা? আপনার কি হয়েছে? 

প্রথমত আমাদের মনে রাখা দরকার যে, অক্ষমতায় থাকা-ব্যক্তির কোনও ভুল নয়। তাই কখনও জিজ্ঞাসা করবেন না যে, আপনার কী হয়েছে বা কি সমস্যা? প্রশ্ন করা মন্দ কিছু  নয় কারণ এটি দেখায় যে আপনি কাউকে জানতে আগ্রহী। কিন্তু যেকোনো কথোপকথনে, অতিরিক্ত ব্যক্তিগত কিছু জিজ্ঞাসা করা ঠিক নয়। তাছাড়া, ভেবে দেখুন, আপনার খুব ঘনিষ্ট নয় এমন কারো দ্বারা আপনার রোগ বা চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, আপনি কেমন অনুভব করবেন! আপনি যখন ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ হবেন, তখন হয়তো অক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, সবাই তাদের অক্ষমতা সম্পর্কে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। 

(২) তোমাকে বের হতে দেখে খুব ভালো লাগছে! 

অনেকই ধরে নেয় যে অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য বাড়ি ছেড়ে বের হওয়া একটি বিশাল সংগ্রাম, বা তারা সক্রিয়ভাবে সামাজিক বা বিনোদনমূলক জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম নন। অক্ষমতায় থাকা অনেক লোকের জন্য এটি সত্য নাও হতে পারে। এখানে অন্য আরেকটি সমস্যা হলো, অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের অনেক সময় বিভিন্ন প্রোগ্রাম বা ফাংশন থেকে বাদ দেয়া হয় এই ভেবে যে, 'সে তো এখানে আসতে পারবে না।' তারা হয়তো ড্যান্সক্লাবের মতো নির্দিষ্ট জায়গার  বাইরে থাকে। কিন্তু একজন অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি কেন ডান্স ফ্লোরে বা বন্ধুদের সাথে বসে আনন্দ উপভোগ করতে পারবে না? ব্যক্তির ক্ষমতা বা অক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আপনি তাকে প্রস্তাব দিয়ে তো দেখুন। 

(৩) আমি একজন ভালো ডাক্তারকে চিনি, তার কাছে যান, তিনি আপনাকে ঠিক করতে পারবেন।

এটি একটি ভাল অর্থপূর্ণ পরামর্শ যা দিনশেষে আমাদের ত্রুটিকেই উপস্থাপন করে। প্রথমত, কারো প্রতিবন্ধকতা ফিক্স করা বা নিরাময় সম্পর্কে কথা বলা মানে, আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে তার মাঝে কিছু ত্রুটি আছে। অক্ষমতা থাকা অনেকের জন্য পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে। এটি এমন কিছু নয় যা তারা নেতিবাচক হিসাবে দেখেন। এবং আপনারও এমনভাবে দেখা উচিত নয়।

(৪) কিন্তু তুমি অনেক সুন্দর। 

এখানে প্রসংশা করতে গিয়ে যে ভুলটা আমরা করে ফেলি, তা হলো এই "কিন্তু"র ব্যবহার। এই 'কিন্তু' এটিকে বোঝায় যে, সুন্দর হওয়া আপনার অক্ষমতার সাথে যায় না, 'কিন্তু' তবু আপনি সুন্দর। এটা হাস্যকর। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কেবল পরিপাটি পোশাক বা সচল শরীরে নয়, সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত।

(৫) আপনি বসুন, আমি করছি।

অন্যকে সাহায্য করা ভালো একটি কাজ। সক্ষম ব্যক্তিদেরও কখনো সাহায্য দরকার হতে পারে। তবে অক্ষমতায় থাকাদের জন্য এটি কিছুটা জটিল। একজন অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তির জন্য জিনিসগুলি সহজ করতে চাইলে তাদের স্বাধীনতাকে সম্মান করা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভাল উপায় হতে পারে, ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্য আগে প্রস্তাব দেওয়া, কিন্তু এটিকে খুব জোর করবেন না বা চুক্তিতে পরিণত করবেন না। সাহায্যের হাত এগিয়ে দেওয়া এবং দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, অনেকের মাঝখানে এমন প্রস্তাবে অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ নাও করতে পারেন। 

(৬) এই তো তুমি এটা করতে পেরেছো, কনগ্রেস!  

অনেক সময় লোকেরা অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সাথে শিশুদের মতো আচরণ করেন। যদি তারা সত্যিই শিশু না হয় তবে এটি করা ঠিক নয়। কখনোই ভেবে নিবেন না যে,  একজন অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি আপনার চেয়ে কম বুদ্ধিমান বা অপরিণত। এই ধরনের বাহবা-এর মতো শব্দ বাক্যের  অত্যধিক ব্যবহার, বা খুশি করতে অতিমাত্রায় প্রসংশা যদিও কখনো উদারতাকে প্রকাশ তরে তবে এটি কখনো ব্যক্তির আত্মমর্যাদাকে আঘাত করতে পারে। তাদের সাথে স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখা সম্পর্ককে আরো উন্নত করতে পারে। 

(৭) তোমার জন্য খুব খারাপ লাগে।

অক্ষমতায় থাকা কাউকে এ কথা বলা মানে তার জন্য নিজ অনুভূতির প্রকাশ। হয়তো আপনি ভালোবাসা প্রকাশ থেকেই বলছেন কিন্তু এটি বলা মানে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া যে, তাকে দেখে ভালো লাগার মতো কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এবং এটা ব্যক্তিকে তার অক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে আপডেইট দিতে পারে যা তার মন খারাপের কারণ হতে পারে। পরিবর্তে প্রয়োজনে বলতে পারেন, 'তুমি আমার অনুপ্রেরণা।' 

(৮) ধরে নিবেন আশেপাশে এমন কেউ নেই।

আপনি কোনো অনুষ্ঠানে গেলেন বা পথেঘাটে কোথাও অক্ষমতা নিয়ে বাস করা কাউকে চোখে পড়ল এবং আপনি কৌতুহলপূর্ণভাবে তাকিয়ে রইলেন-মনে মনে ভাবতে লাগলেন, আহারে! কি হয়েছে তার! এমনটি করবেন না। কারণ অক্ষমতা নিয়ে বাস করাদেরও ষষ্ঠইন্দ্রিয় কাজ করতে পারে এবং আপনার তাকানোর অর্থ তারা বুঝতে পারে। কাজেই, আশেপাশে এমন কেউ আছে, সেটাই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। স্বাভাবিকভাবে ভাবুন। তাছাড়া এমন উৎসুক দৃষ্টি ব্যক্তির পাশে থাকা পরিবারের কাউকেও বিভ্রান্ত করতে পারে। 

(৯) তোমাকে দেখলে একদম স্বাভাবিক লাগে।

কখনো আমরা অক্ষমতায় থাকাদের দেখে হুট করেই তাদের সঙ্কটগুলো বুঝতে পারি না কিংবা কেউ নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়েও সবকিছু ঠিকঠাক মতো করার চেষ্টা করেন। অনেক সময় আমরা তাদের দেখে বিস্মিত হই এবং বলে ফেলি, তোমাকে দেখে বোঝায় যায় না তুমি এতো সঙ্কট নিয়ে লড়ছো। এ কথা বলা মানে, তার এই অবস্থানে থাকার কথা না। আপনি আশা করছিলেন হয়তো, কষ্টে জর্জরিত জবুথবু হতাশাগ্রস্ত কাউকে দেখার। এমন মন্তব্য এড়িয়ে চলুন। 

(১০) আপনি খুব অনুপ্রেরণামূলক।

আবারও, এটি একটি ভাল অর্থপূর্ণ মন্তব্য। আপনি যার সাথে কথা বলছেন সে যদি অবিশ্বাস্য কিছু করে থাকে, বা সংগ্রামের সাথে উচ্চাভিলাষী কোনো লক্ষ্য অর্জন করে থাকে, তাহলে অবশ্যয়ই সে অনুপ্রেরণাদায়ক এবং এটা বলা উপযুক্ত হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি কেবল অক্ষমতায় রয়েছে বলে কোনো ব্যক্তিকে খুশি করতে একথা বলেন, তবে বলব, আপনার জিহ্বা ধরে রাখুন। তারা হয়তো এমন একটি জীবনযাপন করছে, যেখানে কেবল কাজে যাওয়া, খাবার রান্না করা এবং তারপর বিশ্রাম নেয়াই তাদের কাজ। এক্ষেত্রে বাড়তি প্রসংশা তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং ভাবতে বাধ্য করতে পারে যে, আপনি তাকে করুণা করছেন। 

আপনি যখন অক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করবেন, তখন মনে রাখা দরকার যে তারা মানুষ। তাদের অক্ষমতা তাদের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি মাত্র। আমাদের মতো তাদের চাহিদাও একই। তাদের সাথে মর্যাদা এবং সম্মানের সাথে আচরণ করুন যেমনটি আপনি আশা করেন অন্যের কাছ থেকে। আপনি যখন অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সাথে আলাপচারিতা করবেন, তাদের অক্ষমতা  নয়, তাদের ক্ষমতার উপর ফোকাস করবেন। অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা হলেন অনন্য ব্যক্তি যাদের প্রচুর জ্ঞান, দক্ষতা, প্রতিভা, আগ্রহ এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে যা আমাদের সমাজে অসাধারণ বৈচিত্র্য, সম্পদ এবং সৃজনশীল শক্তি যোগ করে।

মনে রাখবেন, অক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা হয়তো আমাদের অনেকের চেয়ে ভিন্ন উপায়ে কাজ করেন, তবে তারা একই সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম। 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন