https://www.prothomalony.com/

6789

north-america

উত্তর আমেরিকা

শান্তিতে নোবেলজয়ী নারগিস মোহাম্মদি অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী এক ব্যক্তিত্ব

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৩৮

এই বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ইরানের জেলবন্দী মানবাধিকারকর্মী নারগিস মোহাম্মদি। নারগিস ইরানে খুবই পরিচিত নাম। সাম্প্রতিককালে সারা বিশ্বেই  তিনি বেশি করে প্রচার পেয়েছেন। ইরানের এই নারী বহু বছর ধরে মানবাধিকার নিয়ে লড়াই করে চলেছেন। এ জন্য তিনি সীমাহীন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

তিনি আরাম-আয়েশ, শান্তির জীবন বিসর্জন দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন এক প্রতিবাদী জীবন। ধর্মের নামে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া জবরদস্তিমূলক বিধিবিধানের বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়েছেন। আর তাতেই তিনি ক্ষমতাসীন মৌলবাদী চক্রের রোষানলে পড়েছেন বারবার।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অদম্য প্রাণশক্তির অধিকারী এক ব্যক্তিত্ব। ইমাম খোমেনি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন নারগিস। সেখানে তিনি পদার্থবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজে পড়াকালেই তিনি সমতা এবং নারীর অধিকারের পক্ষে একজন বলিষ্ঠ কর্মী হয়ে ওঠেন। পড়াশোনা শেষ করার পরে তিনি প্রকৌশলী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার ব্যাপারে আত্মনিয়োগ করেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিয়ে প্রকৌশলী হিসেবেই কর্মজীবন শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সংস্কার-মনোভাবাপন্ন সংবাদপত্রের জন্য কলামও লিখেছিলেন।

২০০৩ সালে তিনি তেহরানের ডিফেন্ডারস অব হিউম্যান রাইটস সেন্টারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এটি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী শিরিন এবাদির প্রতিষ্ঠা করা একটি সংস্থা। ২০১১ সালে নারগিসকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেই সময়ে কারাবন্দী মানবাধিকারকর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করার প্রচেষ্টার জন্য তাঁকে বহু বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

২০১৩ সালে জামিন পাওয়ার পর নারগিস মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২০১৫ সালে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে থাকাকালে তিনি রাজনৈতিক বন্দীদের, বিশেষ করে নারীর বিরুদ্ধে সরকারের পদ্ধতিগত নির্যাতন এবং যৌন হেনস্তার বিরোধিতা করেন।

গত বছর ইরানি নীতি পুলিশের হেফাজতে কুর্দি যুবতী মাহশা আমিনির মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরই তিনি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানান এবং তাঁর সহবন্দীদের সংগঠিত করেন। তাঁর এই কাজের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। নারগিসের ফোনে কথা বলা এবং ভিজিটরের সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করা হয়েছিল। তবু তিনি জেল থেকে একটি নিবন্ধ পাচার করতে সক্ষম হন, যা নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করেছিল মাহশা আমিনির হত্যার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে।

তিনি গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। একই সঙ্গে নারীর অধিকার আদায় ও নারীমুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার ব্রত নিয়েছেন। তাই তো তিনি অজস্রবার আটক হয়েছেন। সব মিলিয়ে ৩১ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। তাঁকে দোররা মারা হয়েছিল ১৫৪ বার। তিনি স্বামী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁরা প্রবাসী। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

২০২২-এ ইরানের হিজাববিরোধী গণ-আন্দোলন দাঁড়িয়ে ছিল তিনটি শব্দের ওপরে। তা হলো, ‘নারী-জীবন-স্বাধীনতা’। নারগিস মোহাম্মদির সারা জীবনের কাজের বিষয়বস্তুও ছিল তা-ই।

এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভের পর নারগিস মোহাম্মদি লিখেছেন, তিনি জেলখানার জানালা দিয়ে তেহরানের উত্তর দিকের পাহাড়ের গায়ে গাছ ও ফুলদের দেখেন। ওই জানালার ফাঁকটুকুই তাঁর বিশ্ব। মুক্ত এক ইরানের কথা ভাবার জন্য ওই দৃশ্যটিই সম্বল। তিনি বলেন, ‘আরও শাস্তি দিক ওরা আমাকে, আরও কেড়ে নিক আমার স্বাধীনতা, তত আমি হয়ে উঠব আরও বেশি বদ্ধপরিকর। গণতন্ত্র আনতেই হবে ইরানে। স্বাধীনতা চাই ইরানে।’

নারগিসের পুরস্কারপ্রাপ্তি কয়েক বছর ধরে নারী অধিকারের পক্ষে সংগঠিত প্রতিবাদ ও সরকারপক্ষের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে যোগ্য প্রত্যুত্তর। লন্ডনে বসবাসকারী ইরানি সাংবাদিক মারিয়াম ফুমামি, ‘এক্স’-এ (টুইটার) লিখেছেন, ‘এ জয় আমাদেরই জয়।’ জেলখানার বাইরে আর ভেতরে, অজস্র মৃতের কবরখানায় নারগিসের নাম অনুরণিত হচ্ছে। যে লড়াই চলছে আমাদের সবার, ইরানের মেয়েদের, তারই যেন একটা স্বীকৃতি মিলল নারগিসের জয়ে। পৃথিবী ইরানের ভেতরের গণ-আন্দোলনের কণ্ঠস্বর নতুন করে শুনতে পেল।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন