https://www.prothomalony.com/
6757
north-america
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৩ ০৯:১৫
কাদম্বিনী গাঙ্গুলী (১৮ জুলাই, ১৮৬১ - ৩ অক্টোবর, ১৯২৩) ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দুই জন নারী স্নাতকের একজন এবং ইউরোপীয় চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী চিকিৎসক। উনিশ শতকের শেষভাগে তিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসায় ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আনন্দীবাঈ জোশীর সাথে তিনিও হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথমদিককার একজন নারী চিকিৎসক।
ব্রাহ্ম সংস্কারক ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনীর জন্ম হয় ১৮ই জুলাই ১৮৬১ তে বিহারের ভাগলপুরে। তার মূল বাড়ি ছিলো বাংলাদেশের বরিশালের চাঁদশীতে। তাঁর বাবা ভাগলপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
দ্বারকানাথ ও তাঁর বন্ধু কাদম্বিনীর পিসতুতো দাদা মনমোহনের হাত ধরে কাদম্বিনী তাঁর পড়াশোনা আরম্ভ করেন হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে। স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি ১৮৭৮ সালে প্রথম মহিলা হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাস করেন। তাঁর দ্বারাই প্রভাবিত হয়ে বেথুন কলেজে প্রথম এফ.এ (ফার্স্ট আর্টস) এবং তারপর অন্যান্য স্নাতক শ্রেণি আরম্ভ করে। কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু বেথুন কলেজের প্রথম গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁরা বি.এ পাস করেছিলেন। তাঁরা ছিলেন ভারতে এবং সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট।
গ্র্যাজুয়েট হবার পর কাদম্বিনী দেবী সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ডাক্তারি পড়বেন। ১৮৮৩ সালে মেডিকেল কলেজে ঢোকার পরেই তিনি তাঁর শিক্ষক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলিকে বিয়ে করেন। দ্বারকানাথ বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও মানবদরদী সাংবাদিক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। যখন তিনি বিয়ে করে তখন ৩৯ বছর বয়েসের বিপত্নীক, কাদম্বিনীর বয়স তখন ছিল একুশ। কাদম্বিনী ফাইন্যাল পরীক্ষায় সমস্ত লিখিত বিষয়ে পাস করলেও প্র্যাকটিক্যালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অকৃতকার্য হন। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে জিবিএমসি (গ্র্যাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ) ডিগ্রি দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি পাশ্চাত্য চিকিৎসারীতিতে চিকিৎসা করবার অনুমতি পান। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন তিনি সরকারের স্কলারশিপ পান যা ছিল মাসে ২০ টাকা।
তিনি পাঁচ বছর মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করার পর বিলেত যাবার আগে ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কিছুদিন লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করেছিলেন। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে রাজমাতার চিকিৎসার্থে নেপাল যান। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বোম্বে শহরে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে প্রথম যে ছয় জন নারী প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন কাদম্বিনী ছিলেন তাঁদের অন্যতম একজন। পরের বছর তিনি কলকাতার কংগ্রেসের ষষ্ঠ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। কাদম্বিনী ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মহিলা বক্তা। কাদম্বিনী গান্ধীজীর সহকর্মী হেনরি পোলক প্রতিষ্ঠিত ট্রানসভাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি এবং ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মহিলা সম্মেলনের সদস্য ছিলেন। ১৯১৪ সালে তিনি কলকাতায় সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই অধিবেশন মহাত্মা গান্ধীর সম্মানের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। কাদম্বিনী চা বাগানের শ্রমিকদের শোষণের বিষয়ে অবগত ছিলেন এবং তিনি তাঁর স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করেন যিনি আসামের চা বাগানের শ্রমিকদের কাজে লাগানোর পদ্ধতির নিন্দা করেছিলেন। কবি কামিনী রায়ের সাথে কাদম্বিনী দেবী ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বিহার এবং ওড়িশার নারীশ্রমিকদের অবস্থা তদন্তের জন্য সরকার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিলেন।
"ফিজ দিলেই শহরে মিলবে যুবতী ডাক্তারের সেবা।"
হেডলাইন দেখে গাঙ্গুলি বাড়ির বড়ো কর্তা হাতের খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে তাঁর স্ত্রীকে ডেকে বললেন মেজো বউকে একবার ডেকে দাও তো। একগলা ঘোমটা দিয়ে ভাসুর ঠাকুরের সামনে এসে দাঁড়ালেন কাদম্বিনী। ডেকেছেন দাদা? ভাসুরের কন্ঠে যেন মেঘ ডাকলো। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বঙ্গবাসী পত্রিকাটি দেখিয়ে বললেন, পড়ে দেখো। তোমার জন্য তোমার স্বামীর, আমাদের পরিবারের সম্মান আজ কোথায় নেমেছে। নিজের জেদটাকেই চিরকাল বড়ো করে দেখলে। আর দ্বারকাও তোমার তালেই তাল দিয়ে গেলো। ছি ছি, খবরের কাগজ দেখে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।
কৌতূহলের সঙ্গে পত্রিকাটি তুলে নিলেন কাদম্বিনী দেবী। প্রথম পাতাতেই চোখ আটকে গেলো। কান মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো রাগে। কী নির্লজ্জ আক্রমন, কী কুৎসিত কার্টুন। দ্বারকানাথ রূপী একটি ভেড়া, তাঁকে দড়ি বেঁধে ঘোরাচ্ছেন কাদম্বিনী। তাঁর পাশে রসিয়ে রসিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে তাঁর খবর। "ফিজ দিলেই শহরে মিলবে যুবতী ডাক্তারের সেবা।" কি নির্লজ্জ ইঙ্গিত !
রাগে অভিমানে চোখে জল এলো তাঁর। একটা মেয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচবে, ঘর সংসার সামলে পড়াশোনা করবে, তাতে সমাজের এতো জ্বালা কিসের? তাঁর স্বামী এতে সমর্থন দিয়েছে বলে এতো কুরুচিকর আক্রমন!! আর বাইরে কাকে বলবেন? তাঁর ভাসুর, তাঁর শ্বশুরবাড়ির সকলেই তো অমনটাই ভাবেন। তবে স্বামী পেয়েছেন ভাগ্য করে। নারী উন্নতির ফাঁকা বুলি না, মন থেকে বিশ্বাস করেন নারীদের শিক্ষা,নারীদের সাবলম্বী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। নিজের স্ত্রীর পাশে সর্বান্তকরণে দাঁড়িয়েছেন সবসময়।
দোষ কী কাদম্বিনীর? ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম মহিলা স্নাতকের ডিগ্রী লাভ করার পর তিনি চেয়েছিলেন ডাক্তারি পড়তে। বাধা এসেছিল পদে পদে। প্রথমে সমাজ, প্রতিবেশী, আত্মীয় সকলে চমকে উঠেছিল। সে কি! মেয়ে পড়বে ডাক্তারি! সব ছেলেদের মাঝে একা! শরীর নিয়ে শিক্ষা। ইজ্জত থাকবে সেখানে? সমাজ কী বলবে? চারদিকে নেতিবাচক কথার মাঝে সায় দিলেন বাবা। তুই ডাক্তারী পড়। সমাজের ফালতু কথায় কান দিসনা। মহিলা ডাক্তার খুব দরকার এই পোড়া দেশের। এরা ধর্ম ধরে বসে থেকে বাড়ির মেয়েদের পুরুষ ডাক্তার দেখাবে না, আবার মেয়েদের ডাক্তারও হতে দেবে না। মাঝখান থেকে মরবে ঘরের মেয়েগুলো।
সেই উদার মানবতাবাদী সমাজসংস্কারক মানুষটির নামে এমন কুৎসা! শিক্ষা দিতে হবে বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক মহেশ পালকে। আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। দ্বারকানাথ বললেন, ছেড়ে দাও, কী দরকার এইসবে? কিন্তু কর্তব্যে অটল কাদম্বিনী। বললেন, না। এই লড়াই আমার নিজের জন্য নয়, বাংলার ঘরে ঘরে যেসব মেয়েরা শিক্ষার জন্য গুমরে মরছে, সমাজের ভয়ে এগোতে পারছে না। এ লড়াই তাদের জন্য। যাতে শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসা নারীদের কেউ কলঙ্ক লাগাতে না পারে, এ লড়াই তার জন্য লড়াই। লড়লেন তিনি। মহেশ পালকে ১০০ টাকা জরিমানা আর ৬ মাসের কারাবাসের ব্যবস্থা করে তবে থামলেন।
আইনের লড়াইতে জিতলেও, সমাজের লড়াইতে জয়ী হওয়া অতো সহজ ছিলনা। রক্ষণশীল সমাজ রীতিমতো ঘৃনার চোখে দেখতো তাকে। এমনই এক পরিবার ছিল কলকাতার রায়চৌধুরী পরিবার। গৃহকর্তা মনে করতেন মেয়েদের স্থান অন্দরমহলে। আধুনিক শিক্ষা বিগড়ে দেয় মেয়েদের। সেই পরিবারের আদরের কন্যা সন্তানসম্ভবা। মেয়েকে নিজের কাছে আনিয়ে রাখলেন। একদিন রাত্রে প্রসব বেদনা উঠলো। ধাই মা বলা ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলো। মেয়ে তখন যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। পরিবারের চিকিৎসকের ডাক পড়লো।তিনি পর্দার বাইরে বসে শুনে শুনে নিদান দিতে শুরু করলেন। ধাই সুবিধা করতে পারলেন না। আসতে আসতে এলিয়ে পড়তে লাগলেন সুলতা। ডাক্তার সেন কর্তাকে ডেকে বললেন, এইভাবে চিকিৎসা সম্ভব না। যদি পুরুষ ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা না করান, কাদম্বিনী গাঙ্গুলিকে কল দিন। সম্প্রতি লন্ডন থেকে বিরাট ডিগ্রি নিয়ে ফিরেছেন। একটু ইতস্তত করে কর্তা বললেন, এই রাত্রে তিনি আসবেন? সমাজ কী বলবে তাঁকে? ঝংকার দিয়ে উঠলেন ডাক্তার সেন। সমাজ বলতে তো আপনাদের মতো গোঁড়া লোকেরা। আধুনিক পৃথিবীতে তাদের মতামতের কোনো দাম নেই শিক্ষিতদের কাছে। আপনারা এবার মুখ বন্ধ রাখুন। মেয়েটাকে বাঁচান আগে।
লজ্জা, সংস্কার, ঐতিহ্যের অহংকার চেপে রেখে রায়চৌধুরী বাড়ির গাড়ি গিয়ে দাঁড়ালো কাদম্বিনীর দ্বারে। কাদম্বিনী জানতেন এই রক্ষণশীল পরিবারটিকে। গাঙ্গুলিদের সমাজচ্যুত করার জন্য তাঁরা খু্বই সচেষ্ট ছিলেন। সেই পরিবার আজ তাঁর শরণাগত। মুহূর্তে তৈরি হলেন তিনি। গাড়িতেই শুনে নিলেন কেস হিস্ট্রি। তৈরি হলেন মনে মনে, আজ তাঁর আসল পরীক্ষা। রায়চৌধুরী বাড়িতে সেদিন যমে মানুষে টানাটানি। খুব ক্রিটিকাল কন্ডিশন। পেশেন্ট খুব খারাপ অবস্থায়। তিনি বললেন আপনাদের গাফিলতিতে আজ এই পরিস্থিতি। পেশেন্টকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছি। কিন্তু বেবির কোনো গ্যারান্টি নেই। অবশেষে বেরিয়ে এলেন ক্লান্ত কাদম্বিনী দেবী। ঘরের ভেতরে কান্নার আওয়াজ। না সে আওয়াজ দুঃখের নয়, কচি গলার কান্না, স্বস্তির কান্না। রায়চৌধুরী বাবু এগিয়ে এলেন। কাদম্বিনী গম্ভীর মুখে বললেন আপনার মেয়ে সুস্থ আছে। বেবিও পুরো ফিট। নাতনি হয়েছে আপনার। প্রৌঢ়ের চোখে চকচক করে উঠলো জল। আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাই? আশীর্বাদ করুন এই মেয়ে যেন আপনার মতোই ডাক্তার হয়। আপনার ফিজ কতো দেবো মা? হঠাৎ আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেলো কাদম্বিনীর গলা। ফিজ দিতে হবে না। যেটা বললেন সেটাই করুন। মেয়েটাকে শিক্ষা দিন। বিকশিত হতে দিন কুঁড়ি গুলিকে।হুস করে বেরিয়ে গেলো কাদম্বিনীর গাড়ি।
এই হলেন কাদম্বিনী। সমাজের কলঙ্ক গায়ে মেখেও সংকল্পে ছিলেন অটুট। রক্ষণশীল পরিবারের মহিলাদের অসুস্থতায় ডাক পেলেই যেতেন রাতবিরেতে। চিকিৎসার বিনিময়ে সংকল্প করিয়ে নিতেন মেয়েদের শিক্ষা দেবার। তাঁর থেকে সাহস পেয়ে, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু নারী এগিয়ে এসেছেন নিষেধের বাধা ঠেলে। এগিয়েছে সমাজ, এগিয়েছে দেশ।আজ ভারতের যত মহিলা চিকিৎসক, সবার কাছে তিনি ভগীরথ, পথপ্রদর্শক।
কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, শুধু চিকিৎসক নন, এক লড়াই, এক সংস্কারক, এক প্রেরণা। কিন্তু তিনি আজ বিস্মৃতির অন্ধকারে। তাঁর নামে হয়নি মেডিকেল কলেজ, রাস্তা, মূর্তি কোনো কিছুই। তিনি তা চান ও নি। যা চেয়েছেন তা হয়েছে, হাজারে হাজারে মেয়ে নিচ্ছে চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ। স্বপ্ন দেখছে চিকিৎসক হবার। সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিলেন তিনি |
হতে পারে সেটা উনিশ শতক। হতে পারে নবজাগরণের লগ্ন। কিন্তু তখনও সব অন্ধকার কাটেনি। তখনও নারীর জয়গান সর্বত্র গীত হতে শুরু করেনি। তখনও নারীর চলার পথে প্রভূত বাধা। এরকম কত বাধা, কত সঙ্কট পেরিয়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি 'কাদম্বিনী গাঙ্গুলি' হয়েছিলেন৷
১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ অক্টোবর একটি অপারেশন সেরে বাড়ি ফেরার পথে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় কাদম্বিনী গাঙ্গুলির।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন