https://www.prothomalony.com/

5965SABAA

north-america

উত্তর আমেরিকা

স্যাক্রামেন্টোতে স্বদেশীদের ক্যাম্পিং

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৩ ০৮:১২

গাড়ি ছুটে চলছে সারি সারি  পাইন গাছের ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে। এক পাশে লেকের শান্ত নীল জল। রোদের তেজ কমে এসেছে। গাছের চূড়োয় একটা মায়াবী সোনালি আলো জড়িয়ে আছে। আমরা ক্যাম্পগ্রাউন্ডের খুব কাছে চলে এসেছি। প্রতি বছরের মতো এবারো বৃহত্তর স্যাক্রামেন্ট এলাকার বাঙ্গালিদেরকে নিয়ে SABAA (Sacramento Area Bangladeshi American Association ) ক্যাম্পিঙের আয়োজন করেছে। এবারের ক্যাম্পিং সিয়েরাভিলে। শুনেছি এখানে উচ্চতার কারণে রাতে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। এবড়ো থেবড়ো মাটির রাস্তা পেড়িয়ে আমরা যখন ক্যাম্প সাইটে পৌঁছেছি তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়েছে। আমাদের আগে অনেকেই ইতিমধ্যে এসে গেছে। জমিয়ে খাওয়া হচ্ছে চটপটি, চিপ্স। বিশাল হাড়িতে গরম চা ফুটছে। বাঙ্গালি যেখানে, সেখানেই খাওয়ার আয়োজন। উঁচু উঁচু গাছের জন্য সন্ধ্যার আগেই মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমরা একটু দূরে একটা জায়গা খুঁজে নেমে পড়লাম আমাদের তাঁবু টাঙ্গাতে, এটা হবে আমাদের আগামী দুই রাতের আস্তানা। তাঁবু টাঙ্গাতে টাঙ্গাতে মাগ্রেবের নামাজের সময় হয়ে গেলো। জামাতে এক সাথে নামাজ পড়া হোল। ছেলেদের পেছনে মেয়েরা। খোলা আকাশে নীচে প্রকৃতির মাঝে জামাতে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা বেশ কঠিন। প্রকৃতি, স্রষ্টা আর সৃষ্টির নিবিড় যোগাযোগ।

মাগ্রেবের পরপরই ঝুপ করে আধার নেমে এলো। এখানে কোন ইলেক্ট্রিসিটি নাই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাছে গাছে কয়েকটা লন্ঠন ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই সম্বল। রাতের খাবারের আয়োজন অসামান্য। খিচুড়ি, ডিম ভুনা, গরুর মাংস, সালাদ আর আচার। পরিবেশের কারণে  কিনা জানি না, এই খাবারের স্বাদ বহুদিন মুখে লেগে থাকবে। একসাথে প্রায় ১৪০ জন লোকের এই খাওয়ার আয়োজন করেছে SABAA । আর প্রতিবারের মতো খাওয়া রান্না থেকে শুরু করে, পরিবেশন, তারপরের গোছগাছ সব কাজই করেছে দলের ছেলেরা। প্রতিবছর আমাদের মহিলাদের জন্য এই দারুণ উপভোগ্য এক সুযোগ। খাওয়ার পর ক্যাম্পফায়ারের আগুনে  বাচ্চারা স্মোর বানালো। সেই আলোতে বসে বসে বড়রা গান গাইল, চাইনিজ হুইস্পার গেম খেলল আর একদল চলে গেলো আকাশের তারা দেখতে। অরণ্যর নিশ্ছিদ্র আঁধারে আকাশের তারাদের অনেক বেশি পরিষ্কার দেখা যায়। শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে গেলো। ঠাণ্ডাটা ছিল জম্পেশ। জ্যাকেট, দুই লেয়ার কম্বল, কেউ কেউ স্লিপিং ব্যাগের উষ্ণতায় নিজেদের সঁপে  দিয়েও কাঁপছিল। বাথরুমগুলোতে টয়লেট পেপার, আলো, সাবান সব কিছুর ব্যাবস্থা রেখেছিলো দলের কর্মীরা, যেটা বিরাট প্রশংসার দাবি রাখে।

পরদিন সকালে শুরু হোল নাস্তার আয়োজন। একদল স্বাস্থ্য সচেতন মহিলা পুরুষ আবার দল বেঁধে ব্যায়ামের ক্লাস করলো। গরম ক্রসনের এগ স্যান্ডুইচ আর চা খেয়ে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম হাইকিংএ । লেকের পার দিয়ে যেয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নিজেরাই পথ বানিয়ে ঘুরে এলাম। ক্যাম্পে এসে আবার আড্ডা আর খাওয়া দাওয়া। বিভিন্ন ধরনের স্ন্যাকিং। দুপুরের লাঞ্চে বিফ বার্গার আর হট ডগ। বাচ্চারা ইতিমধ্যে লেকে চলে গেছে সারাদিনের জন্য, সাথে কিছু কিছু বাবা, মা, চাচারা। লেকে কায়াকিং, সুইমিঙে ব্যস্ত তারা। আমরা বিকালের আগেই গেলাম স্পিড বোট চড়তে। ভর দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে। কিন্তু আশ্চর্য হয়েছি এতো সুন্দর বাতাস আর রোদটা এমন মোলায়েম মনে হচ্ছিলো এর চেয়ে ভালো সময় আর হয় না। সবুজ পাইন গাছে সুসজ্জিত পাহাড়ে ঘেরা নীল জলের লেকে নীল আকাশে সাদা মেঘের ছায়া পড়েছে, কী যে ভালো লাগছিলো। নিজেকে মনে হচ্ছিলো লেকের বুকে ভেসে বেড়ানো হংস মিথুন। ফিরে আসতে মন চাইছিল না একদম। কিন্তু সময় বরাদ্দ। তাই ফিরতেই হোল।

বিকালে রকমারি সব নাস্তার সাথে সব বয়সের মানুষের জন্যই বিভিন্ন গেমের ব্যাবস্থা ছিল। ঝাল মুড়ি, চানাচুর, কেক, বিস্কিট কোন কিছুর অভাব নেই। সঙ্গে গরম চা।  প্রতিটা গেম ছিলো ভীষণ মজার। নির্মল আনন্দের মাঝে গেম পর্ব  শেষ হোল পুরস্কার বিতরণীর মাধ্যমে। ইতিমধ্যে গিটার নিয়ে বসে গেছে আমাদের এক স্থানীয় বিশিষ্ট শিল্পী। সন্ধ্যার মায়াবী আলোয় রোমান্টিক সব গানের ঝঙ্কার পরিবেশকে আরও মোহনীয় করে তুলেছিলো। সন্ধ্যা মিলাতে নামাজের শেষে ক্যাম্প ফায়ার তৈরি হোল।  সেই আলোতে আমরা সবাই পিঠা খেলাম। মনে হচ্ছিলো গ্রামের বাড়িতে চুলার পাশের আগুনে বসে পিঠা খাচ্ছি। আর তার পরপরই আসলো এক সারপ্রাইজ ডিনার। অতি সুস্বাদু কাচ্চি বিরিয়ানি, জালি  কাবাব, বোরহানি, আর সালাদ। সেই  রাতেও চলল গান, বাজনা, জোকস, খেলা, বাচ্চাদের স্মোর বানানো আর তারা দেখা।

পরদিন সকালে সবাই ভীষণ টায়ার্ড। তারপরেও একদল অতি উৎসাহী চলে গেছে হাইকিঙে। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ভলান্টিয়াররা সকালের নাস্তা তৈরি করছে। বেগল, ক্রিম চিজ, ডিম সেদ্ধ, চা। তারপর তরমুজ। মনের ভেতর বাড়ি ফেরার তাড়া । আবার একই সঙ্গে সংসার বিরাগ, এখানে থেকে গেলে কেমন হয়? অবশেষে মিলন মেলা  ভাঙ্গতে হোল। দু'রাতের তাঁবুর সংসার গুটিয়ে, বন্ধুদের বিদায় দিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম বাড়ির পথে। গল্পটা শেষ হয়েও হোল না শেষ। ফেরার পথে একটু পরেই আমাকে সারপ্রাইজ দিতে  নিয়ে গেলেন আমার স্বামী। ড্যামের পাশে যেখানে পানির স্রোত খুলে দেওয়া হয়েছে আর সেই পানি বেপরোয়া ঝর্নার মতো আছড়ে পড়ছে লেকের বুকে, সেই ঝর্নায় রঙধনুর খেলা দেখতে। প্রকৃতির এতো কাছে না আসলে সে ধরা দেয় না  তার এই অসীম রূপের ভাণ্ডার নিয়ে।  SABAA কে অসংখ্য ধন্যবাদ এতো সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার জন্য, আমি নিশ্চিত আমেরিকার বুকে খোদ আমেরিকানরাও একশ চল্লিশ সদস্যের এই বিশাল ক্যাম্পিং গ্রুপ কখনো তৈরি করে নি, দেখেনি, শোনেনি। সর্বোপরি এই বিশাল গ্রুপের খাওয়া দাওয়া, বিনোদন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য যে পরিমাণ আয়োজন ও প্রস্তুতি দরকার সেটা অবিশ্বাস্য এবং দৃষ্টান্তের দাবিদার। 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন