https://www.prothomalony.com/

18307

north-america

উত্তর আমেরিকা

আটলান্টিক সিটিতে শহীদ মিনার উদ্বোধন ঘিরে বিভক্তি, ঐক্য ও ইতিহাসের স্বীকৃতির দাবি

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২৫

নিউজার্সির আটলান্টিক সিটিতে সদ্য উদ্বোধন হওয়া স্থায়ী শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বিভাজন, হতাশা ও ক্ষোভের কথা উঠে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে অ্যাটলান্টিক সিটি ও সাউথ জার্সির বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সাংবাদ সম্মেলন করে শহীদ মিনারের ইতিহাসের যথাযথ স্বীকৃতি ও কমিউনিটির ঐক্যের দাবি জানিয়েছেন।

গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বেঙ্গল ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, তাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়। বরং শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষা, ইতিহাসের সত্য তুলে ধরা এবং কমিউনিটির সম্মিলিত অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।

কাজল সরকারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, আটলান্টিক সিটিতে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০০০ সাল থেকে বেঙ্গল ক্লাব অব আটলান্টিক সিটি এ আয়োজন করে আসছে। তবে সংগঠনটি কখনো একুশের আয়োজনকে নিজেদের একক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখেনি। বরং আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে একুশ উদ্‌যাপনে ভূমিকা রেখেছে।

বক্তারা জানান, ২০২৩ সালে আটলান্টিক সিটিতে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সামনে এলে আটলান্টিক সিটি বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ আকবর হোসেনের নেতৃত্বে বেঙ্গল ক্লাবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা একত্র হন। ২০২৪ সালেও এই সম্মিলিত কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে সবার আর্থিক সহযোগিতা ও বেঙ্গল ক্লাবের সদস্যদের শ্রমে কাঠ দিয়ে ভবিষ্যৎ স্থায়ী শহীদ মিনারের আদলে একটি অস্থায়ী মিনার নির্মাণ করা হয়, যা ২০২৫ ও ২০২৬ সাল পর্যন্ত একই স্থানে ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা ডাকটাউন সিডিসির অফিসিয়াল রিবন কাটিং ফ্লায়ার ও প্রেস উপকরণে বেঙ্গল ক্লাব অব আটলান্টিক সিটির নাম ‘কমিউনিটি পার্টনার’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। তাদের দাবি, এ স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেঙ্গল ক্লাবের কোনো প্রতিনিধিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

বক্তারা বলেন, বিষয়টি শুধু বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কমিউনিটির বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন, প্রেস ক্লাব, লায়ন্স ক্লাব, বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কেন ঐতিহাসিক এই উদ্বোধনী প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি—এটাই তাদের মূল প্রশ্ন।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক সুব্রত চৌধুরীকে নিয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও তুলে ধরা হয়। বক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটলান্টিক কাউন্টি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের শহীদ খান উপস্থিত জনতার সামনে শুব্রত চৌধুরীকে ‘ফলস সাংবাদিক’ ও ‘মিথ্যা লেখেন’ বলে মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে সুব্রত চৌধুরী বলেন, যে লেখা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল, সেটি কোনো সংবাদ প্রতিবেদন নয়; তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে প্রকাশিত নিজস্ব লেখা।

বক্তারা বলেন, কোনো সাংবাদিকের লেখা নিয়ে আপত্তি থাকলে তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে তার জবাব দেওয়া যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে ভাষার অধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকারের স্মারক শহীদ মিনারের সামনে এমন ঘটনা দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।

এ ছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং ভাষা শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। তাঁদের দাবি, এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে। যদি জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও নীরবতা পালন করা হয়ে থাকে, তাহলে অনুষ্ঠানের পূর্ণ ভিডিও বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রকাশের আহ্বান জানান তাঁরা।

সংবাদ সম্মেলনে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, ভবিষ্যতে একুশে ফেব্রুয়ারি ও শহীদ মিনারকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা ও সমন্বয় করা, শহীদ মিনারকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক কৃতিত্ব বা নিয়ন্ত্রণের প্রতীক না বানিয়ে সর্বজনীন স্মৃতিসৌধ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া এবং ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক মতবিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।

সংবাদ সম্মেলনে লেখক ও সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী, হেলাল হাসান, আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ দিদার, শেখ আমীন, সাঈদ দোহা, পাপলু চৌধুরী, ফারুক হোসেন, এনামুল হক, সবুর মিয়া, আকবর হোসেইন, মোহাম্মদ শাহীন, জাকির হোসেন, মনিরুল আলম বাবু, আওলাদ হোসেইনসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, তারা কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে দেখছেন না এবং পাল্টা বিভাজনও চান না। তাদের দাবি, শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে আধিপত্য নয়, সবার অংশগ্রহণ এবং একক কৃতিত্বের পরিবর্তে ইতিহাসের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সম্মেলনের শেষে বক্তারা আগামী একুশে ফেব্রুয়ারিতে একই শহীদ মিনারের সামনে কমিউনিটির সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নয়, এর সঙ্গে জড়িত সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস এবং ঐক্যবদ্ধ কমিউনিটিও রেখে যাওয়া প্রয়োজন।

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন