https://www.prothomalony.com/

18254

bangladesh

বাংলাদেশ

কিশোর গ্যাং: অপরাধী তৈরি হওয়ার আগে আমরা কোথায় ছিলাম?

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:১৩

কিশোর গ্যাংয়ের কোনো ঘটনা সামনে এলেই আমাদের প্রথম প্রশ্ন হয়—অপরাধী কোথায়? তাকে ধরতে হবে, আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশ্নটি জরুরি। অপরাধের শিকার মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও জরুরি—একজন কিশোর অপরাধের জগতে ঢোকার আগে তার জীবনে কী ঘটেছিল?

সেপ্টেম্বরে কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড কিশোর অপরাধ ও গ্যাং-সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঘটনাটিকে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলে এর সামাজিক তাৎপর্যের বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। পরিবার, বিদ্যালয়, সামাজিক পরিবেশ, অনলাইন জগৎ, অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বিষয়টি আরও বড়।

রাজধানীতে ৫০টি থানার এলাকায় ১১৮টি কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা থাকার কথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তবে কোনো তালিকায় থাকা গোষ্ঠীর সংখ্যা দিয়ে পুরো দেশের কিশোর অপরাধের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—কেন একটি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে পরিচয়, শক্তি কিংবা স্বীকৃতি খুঁজে নিতে শুরু করে?

কিশোরের আগে মানুষটিকে দেখা

কিশোর অপরাধের আলোচনায় আমরা প্রায়ই একটি সরলরেখা টেনে দিই—অপরাধ করেছে, তাই অপরাধী। কিন্তু একজন কিশোরের আচরণকে তার বয়স, পারিবারিক পরিবেশ, বন্ধুত্ব, বিদ্যালয়, সামাজিক পরিসর ও জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

এর অর্থ অপরাধের দায় অস্বীকার করা নয়। বরং দায়কে পূর্ণভাবে বোঝা। কারণ শাস্তি অপরাধের প্রতিক্রিয়া; প্রতিরোধ হলো অপরাধের আগে পৌঁছানোর চেষ্টা।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশি বিশ্লেষণেও পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক চাপ, সহপাঠী-প্রভাব, অনলাইন সংস্কৃতি এবং নিরাপদ সামাজিক পরিসরের অভাবকে কিশোর অপরাধের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও এসেছে—শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।

তাই কিশোর গ্যাং শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। এটি সমাজ কীভাবে তার কিশোরদের বড় করছে—সেই প্রশ্নও।

পরিবার কি শুধু খরচ বহন করবে?

একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। সেখানে সে শেখে সম্পর্ক, বিশ্বাস, সীমা, দায়িত্ব এবং নিজের মূল্য সম্পর্কে ধারণা। কিন্তু পরিবার যখন শুধু খাবার, পোশাক, স্কুলের খরচ ও পরীক্ষার ফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন সন্তানের ভেতরের পরিবর্তন অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়।

পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দুর্বল অভিভাবকীয় সম্পৃক্ততা, অবহেলা কিংবা আবেগগত দূরত্ব কিশোরকে বাইরে স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির সন্ধানে ঠেলে দিতে পারে—গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ আলোচনায় এমন সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

তবে পরিবারকে একমাত্র দায়ী করা সহজ, কিন্তু যথার্থ নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অর্থনৈতিক চাপ, নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে অনেক অভিভাবকের হাতে সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে গেছে।

তাই প্রশ্ন শুধু 'অভিভাবক কোথায়?' নয়; পরিবারকে সন্তান পালনের কাজে সহায়তা করার সামাজিক ব্যবস্থা কোথায়?

বিদ্যালয় কি শুধু ফলাফল দেখে?

একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। বন্ধু বদলে যাচ্ছে। আচরণে আগ্রাসন বাড়ছে। পড়াশোনায় আগ্রহ কমছে। সে হয়তো নতুন কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

এসব সংকেত কি বিদ্যালয় শনাক্ত করতে পারে?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফল, উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা দৃশ্যমান; কিন্তু শিক্ষার্থীর আচরণগত পরিবর্তন, বুলিং, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা সহিংসতার ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। অথচ একটি কিশোর বিপথে যাওয়ার আগে পরিবার ও বিদ্যালয়ই তাকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখতে পারে।

তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান শুধু পুলিশ হতে পারে না। সেখানে থাকতে হবে পরিবার, বিদ্যালয়, শিক্ষক, সমাজকর্মী ও স্থানীয় সমাজকে।

মাঠ হারালে শূন্যস্থান কে পূরণ করবে?

কিশোর বয়স মানেই শক্তি, কৌতূহল, বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা ও নিজের পরিচয় খোঁজার সময়। সেই শক্তির সুস্থ প্রকাশের জন্য দরকার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার, বিতর্ক, সামাজিক সংগঠন এবং নিরাপদ জনপরিসর।

এসবকে আমরা অনেক সময় 'অতিরিক্ত' বিষয় মনে করি। আসলে এগুলো সামাজিকীকরণের অবকাঠামো।

একটি কিশোরের খেলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক পরিসর নেই, নিরাপদ বন্ধুত্বের জায়গা নেই—তার সময় ও পরিচয়ের জায়গা তো শূন্য থাকবে না। সেই জায়গা কেউ না কেউ দখল করবে।

প্রশ্ন হলো, আমরা সেই জায়গা কিশোরের হাতে তুলে দিচ্ছি, নাকি অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দিচ্ছি?

হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের ভূগোল

আমরা শুধু কিশোরদের খেলার মাঠ হারাইনি; হারিয়েছি তাদের শৈশবের ভূগোল। নদী নেই, খাল নেই, বিল নেই, বন নেই—অনেক শহর ও জনপদে নেই এমনকি একটু উন্মুক্ত আকাশের নিচে নিরাপদে দৌড়ানোর জায়গাটুকুও। অথচ এসব ছিল শিশু-কিশোরের নীরব বিদ্যালয়। সেখানে তারা খেলতে খেলতে বন্ধুত্ব শিখত, ঝগড়া করে মিটমাট করতে শিখত, হেরে গিয়ে আবার দাঁড়াতে শিখত, প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে নিজের শরীর ও মনকে চিনত। এখন সেই স্বাভাবিক সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়ে কংক্রিট, যানবাহন ও পর্দার জগতে ঢুকে পড়ছে। ফলে কিশোরের শক্তি, কৌতূহল, সাহস ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষার জন্য বৈধ ও সৃজনশীল জায়গা কমে যাচ্ছে। এর মানে এই নয় যে নদী-খাল হারালেই কিশোর অপরাধী হয়ে ওঠে; কিন্তু একটি শিশুর চারপাশ থেকে নিরাপদ সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিসর যত সরিয়ে দেওয়া হয়, তার সুস্থ বিকাশের সুযোগও তত সংকুচিত হয়। তাই কিশোর অপরাধের কারণ খুঁজতে গিয়ে শুধু প্রশ্ন করা নয়—আমরা তাদের কাছ থেকে কী কী জায়গা কেড়ে নিয়েছি, সেই প্রশ্নটিও করতে হবে।

অনলাইন জগৎ: কারণ নয়, নতুন বাস্তবতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কিশোর অপরাধের একমাত্র কারণ বানানোও ভুল। অনলাইন মাধ্যম শিক্ষা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সংযোগের বড় ক্ষেত্র।

কিন্তু ডিজিটাল জগৎ নতুন কিছু ঝুঁকিও তৈরি করেছে—সহিংসতার প্রদর্শন, গোষ্ঠীগত পরিচয়, অনলাইন স্বীকৃতি, অপমানের প্রকাশ্যতা এবং অপরাধের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া। সাম্প্রতিক বিশেষজ্ঞ আলোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'দ্রুত বড় হয়ে ওঠা' এবং সহিংসতাকে আকর্ষণীয় করে দেখানোর প্রবণতার কথাও এসেছে।

অতএব সমাধান প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষা—কী দেখা উচিত, কী বিশ্বাস করা উচিত, কী শেয়ার করা উচিত এবং অনলাইনের আচরণ কীভাবে বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

কিশোরকে ব্যবহার করছে কারা?

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি এখানে। কোনো কিশোর যদি চাঁদাবাজি, মাদক, সহিংসতা বা অন্য অপরাধে ব্যবহৃত হয়, তাহলে শুধু তাকে আটক করলেই কি অপরাধের কাঠামো ভেঙে যায়?

কিশোরের হাতে অস্ত্র বা মাদক পৌঁছায় কীভাবে? তাকে অর্থ দেয় কে? নির্দেশ দেয় কে? তার অপরাধের পেছনে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নেটওয়ার্ক আছে কি না—এসব প্রশ্ন তদন্তের অংশ হওয়া দরকার।

গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী, অপরাধী চক্র বা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে। কিন্তু অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তদন্ত, নথি, মামলা বা আদালতের প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।

তবে একটি নীতিগত প্রশ্ন থেকেই যায়: কিশোর যদি অপরাধের হাতিয়ার হয়, তাহলে শুধু হাতিয়ারটিকে শাস্তি দিয়ে কি মূল কাঠামো অক্ষত রাখা হচ্ছে?

আইন প্রয়োগের সঙ্গে পুনর্বাসন

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩-এ ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং শিশুদের জন্য পৃথক বিচারিক ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার কাঠামো রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব অপরাধ তদন্ত নির্দেশিকাতেও শিশু আইনের বিশেষ বিধানের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এর অর্থ এই নয় যে শিশু অপরাধ করলে জবাবদিহির বাইরে থাকবে। বরং অর্থ হলো—শিশুর অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তার বয়স, পরিস্থিতি, সংশোধনের সম্ভাবনা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন বিবেচনা করতে হবে।

সুতরাং কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় চারটি কাজ একসঙ্গে দরকার—আইন প্রয়োগ, আগাম প্রতিরোধ, পুনর্বাসন এবং প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী কাঠামোর जवाबদিহি।

শুধু অভিযান চালিয়ে কিছু কিশোরকে আটক করা যায়। কিন্তু একই সামাজিক শূন্যতা যদি থেকে যায়, তাহলে নতুন কিশোর আবার সেই জায়গা পূরণ করবে।

আমরা কেমন শৈশব তৈরি করছি?

একটি কিশোর গ্যাংয়ে ঢোকার মুহূর্তটি হয়তো তার জীবনের প্রথম ব্যর্থতা নয়। তার আগে হয়তো পরিবারে যোগাযোগ কমেছে, বিদ্যালয়ে সে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছে, মাঠ হারিয়েছে, সুস্থ বন্ধুত্বের জায়গা সংকুচিত হয়েছে, অনলাইনে অন্য ধরনের স্বীকৃতি পেয়েছে। কোথাও হয়তো একজন প্রাপ্তবয়স্ক তাকে ব্যবহার করার সুযোগও দেখেছে।

এই পুরো পথটি না দেখে শুধু শেষ দৃশ্যটি দেখলে আমরা অপরাধকে বুঝব না; শুধু অপরাধীর পরিচয়টিই দেখব।

অপরাধ হলে আইন প্রয়োগ অবশ্যই করতে হবে। ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে জানতে হবে—অপরাধী তৈরি হওয়ার আগের জায়গাগুলো কোথায় ভেঙে পড়েছিল।

কারণ একটি কিশোরের হাতে অস্ত্র ওঠার আগে তার হাতে হয়তো বই থাকার কথা ছিল, বল থাকার কথা ছিল, বাদ্যযন্ত্র থাকার কথা ছিল, বন্ধুর হাত থাকার কথা ছিল। তার সামনে থাকার কথা ছিল ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন।

সেই জায়গাগুলো আমরা যদি একে একে সংকুচিত করি, তারপর কিশোরটি ভুল দরজায় দাঁড়ালে শুধু তাকে দায়ী করে কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়?

শেষ পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের প্রশ্ন তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটি পরিবারের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের প্রশ্ন, নগরের প্রশ্ন, সামাজিক সংহতির প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রের প্রশ্ন।

আমরা কি শুধু অপরাধী ধরতে চাই, নাকি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে চাই যেখানে একটি কিশোর পরিচয়, বন্ধুত্ব, সাহস ও স্বপ্নের জন্য গ্যাংয়ের প্রয়োজন বোধ করবে না?

একটি সমাজ তার কিশোরদের জন্য কী রেখে যায়, শেষ পর্যন্ত তার ভবিষ্যৎও সেখানেই লেখা থাকে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন