https://www.prothomalony.com/
18162
new-york
তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:২২
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে আসছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি হলেও সফরের সময় ঘনিয়ে আসার পরও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে কোনো নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজন করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়ার লক্ষ্যে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের পক্ষ থেকে সরকারি অর্থে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার একটি আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে সরকারি অর্থ ব্যয় করে এমন আয়োজনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যেকারণে তিতি ওই আয়োজন বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন। দেশের অর্থের অপচয় রোধের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি অর্থে সংবর্ধনা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি উদ্যোগের আয়োজন বাতিল হওয়ার পর প্রবাসীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় ও নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজনের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিএনপি নেতাদের ওপর পড়ে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ সম্প্রতি ঢাকা সফরে গেলে দলীয়ভাবে তাকে এ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। আয়োজন সফল করতে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে এসেছেন। তবে সম্ভাব্য সংবর্ধনা কোথায়, কবে এবং কীভাবে আয়োজন করা হবে, সে বিষয়ে তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাননি। এত বড় আয়োজনের জন্য কোনো হলরুম বুক করা হয়েছে কি না, সে সে সম্পর্কেও কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফর। রাষ্ট্রীয় কাজেই তিনি নিউইয়র্কে আসছেন। রাষ্ট্রীয় কাজের ফাঁকে যদি সুযোগ সৃষ্টি হয় তাহলে প্রবাসী বাংলাদেশী ও নেতাকর্মীদের সাথে একটা সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য তিনি চেষ্টা করছেন। তবে আমরা এখনো এ ব্যপারে স্পষ্ট কোন নির্দেশনা পাইনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এ অনিশ্চয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। হাজার হাজার নেতাকর্মী এখনো নিশ্চিত নন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ হবে কি না। একই সঙ্গে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে কোনো নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে কি না, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রবাসীদের সরাসরি মতবিনিময়ের কোনো কর্মসূচি থাকবে কি না, সে বিষয়েও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। ফ্যাসিবাদি সরকার দেশে লুটপাট করে বিদেশে টাকা নিয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি টাকায় উনি কোন সংবর্ধনা নেবেন না।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীকে আমদের নেতাকর্মীদের খরচে সংবর্ধনা আয়োজনের প্রস্তাব দিলে তিনি তাতে রাজি হয়েছেন। নেতাকর্মীদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, প্রবাসী নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষদের অংশগ্রহণে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা হল খুঁজছি। সুবিধামত হল পেলে আমরা বুকিং করব।
একই ধরনের অপেক্ষায় রয়েছেন নিউইয়র্কে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকরাও। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, পররাষ্ট্রনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বক্তব্য শোনার পাশাপাশি তাঁকে প্রশ্ন করার সুযোগ চান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। অতীতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসা বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি মতবিনিময় বা সংবাদ সম্মেলনের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট বার্তা না পাওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নিউইয়র্কে আগমন ঘিরে আমাদের জোরালো প্রস্তুতি রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর জেএফকে বিমানবন্দরে আমারা বিএনপির নেতাকর্মীরা উনাকে স্বাগত জানাতে যাব। ২৪ সেপ্টেম্বর উনার ভাষণের দিন আমরা জাতিসংঘের সামনে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের সাথে স্বাগতম র্যালী করব। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন আমাদের কমিটি ছিলোনা, যেকারণে আমাদের সাংগঠনিক কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। আমরা চাই দেশে ফিরেই যেন উনি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠনে ব্যবস্থা নেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ঘিরে সংবর্ধনা বা মতবিনিময়ের কোনো সুস্পষ্ট কর্মসূচির আভাস না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির একাধিক প্রবাসী নেতাকর্মী। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি না থাকায় সাংগঠনিকভাবে নানা ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিএনপির স্টেট কমিটি থাকলেও দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কোনো পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি নেই। ফলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে সমন্বিতভাবে বড় কোনো কর্মসূচি আয়োজনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্র যুবদলের সাবেক সভাপতি জাকির এইচ চৌধুরী বলেন, দেশের বাইরে বিএনপির সবচেয়ে বড় ইউনিট হলো যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি পরিবার। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি না থাকায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নাজুক অবস্থা। ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বাংলাদেশীদের টাকা লুট করে যুক্তরাষ্ট্র এসে দেশ বিরোধী কর্মকান্ড করার সুযোগ পাচ্ছে কেবল এখানে বিএনপির শক্ত অবস্থান না থাকার সুযোগে। দীর্ঘ সময় মূল কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীরাও হতাশাগ্রস্থ। হতাশা ও দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে অনতিবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠন করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতা তোফায়েল চৌধুরী লিটন বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন। এ সফরকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদশীদের মধ্যে একটা আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। বিএনপির ব্যানারে সার্বজনীন একটা সংবর্ধনা হবে। ইনশাআল্লাহ ২৫ সেপ্টেম্বর এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। তারেক রহমান নিউইয়র্ক এলে নেতাকর্মীদের চাঙাভাব ধরে রাখতে শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট বিএনপির কমিটি অনুমোদনের ব্যবস্থা নিবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির আরেক নেতা মোতাহার হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ও নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে আমরা নেতাকর্মীরা ধোঁয়াসার মধ্যে রয়েছি। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটা কে আয়োজন করছে? এত বড় একটা প্রোগ্রাম আয়োজন করতে হলে প্রস্তুতির বিষয় থাকে, পরিকল্পনার বিষয় থাকে, আয়োজক কমিটি হবে কিনা, সভাপতিত্ব কে করবে এমন অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় থাকে। বাজেট একটা বড় বিষয়। অর্থের যোগান কিভাবে হবে সেটাও একটা বড় বিষয়। এত বড় আয়োজনে শৃঙ্খলার একটা ব্যাপার আছে। এ আয়োজনের জন্য যিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত তার কাছ থেকেও আমরা কোন ব্রিফিং পাইনি। আমরা বিএনপির নেতাকর্মীরাই এখনো বুঝতে পারছিনা এ সংবর্ধনাটা কিভাবে আয়োজন হবে।
অন্য একজন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতা নাছিম আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দুঃসময়ে বিএনপির রাজনীতি করেছি, আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিয়েছি, দলের জন্য কাজ করেছি। দলের চেয়ারম্যান নিউইয়র্কে আসছেন, আমরা সকলেরই উনার সাক্ষাৎ প্রত্যাশী। তবে সংবর্ধনার আয়োজন নিয়ে আমরা হতাশ। দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সকল নেতাকর্মীর ভাগ্যে উনার সাথে দেখা করার সুযোগ মিলবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দিহান।প্রধানমন্ত্রীর সাথে দলের নেতাকর্মীদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে দায়িত্ব প্রাপ্তদের আন্তরিকতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
প্রবাসী নেতাকর্মীদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির একটি সক্রিয় ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকলে প্রধানমন্ত্রীর নাগরিক সংবর্ধনার মতো বড় আয়োজন দলীয়ভাবে দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অচলাবস্থা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক আগামী ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের আগমন ঘটবে। ফলে শহরজুড়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়বে। এর মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। তবে সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে এসেও নাগরিক সংবর্ধনা, প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি প্রকাশ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এসব আয়োজন হবে কি না, তা নিয়েই এখন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে চলছে নানা আলোচনা ও অপেক্ষা।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন