https://www.prothomalony.com/

18158

north-america

উত্তর আমেরিকা

‘পাবলিক চার্জ’ নীতিতে অভিবাসীদের দমাতে চায় ট্রাম্প, আদালতের দিকে তাকিয়ে লাখো অভিবাসী

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৯

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এবার ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারী বা ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন—এমন অভিবাসীদের গ্রিন কার্ড, ভিসা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। নতুন নীতিটি আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই ২২টি অঙ্গরাজ্য, ওয়াশিংটন ডিসি এবং কয়েকটি বড় শহর ও স্থানীয় সরকার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। ফলে এখন লাখো অভিবাসীর নজর আদালতের দিকে।

নতুন নিয়মটি মূলত বাইডেন প্রশাসনের ২০২২ সালের তুলনামূলক সীমিত ‘পাবলিক চার্জ’ বিধান বাতিল করে অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দিচ্ছে। এর আওতায় খাদ্য সহায়তা, মেডিকেইড, আবাসন ভর্তুকিসহ বিভিন্ন আয়ভিত্তিক সরকারি সুবিধা কোনো আবেদনকারীর অভিবাসন আবেদনের মূল্যায়নে বিবেচনায় আসতে পারে। আগে মূলত সরকারি নগদ সহায়তা ও সরকারি খরচে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক যত্নের মতো সীমিত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হতো।

গ্রিন কার্ডের পথ আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা

নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে গ্রিন কার্ডের আবেদনকারীদের ওপর। কোনো আবেদনকারী সরকারি সুবিধা নিয়েছেন কি না, ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে কি না এবং তার সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি কেমন—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে সরকারি সুবিধা নেওয়া মাত্রই গ্রিন কার্ড বাতিল বা আবেদন প্রত্যাখ্যান হবে—এমন স্বয়ংক্রিয় বিধান নেই। বরং আবেদনকারীর পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু নতুন নিয়মে কর্মকর্তাদের বিবেচনার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত হওয়ায় অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আদালতে ২২ অঙ্গরাজ্য

নতুন নীতির বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের নেতৃত্বে ২২টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসি ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। মামলাকারীদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন আইনগত ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করছে, যা অভিবাসীদের বৈধ সরকারি সুবিধা গ্রহণ থেকেও বিরত রাখতে পারে।

নিউইয়র্ক সিটি, শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটলসহ কয়েকটি স্থানীয় সরকারও পৃথকভাবে মামলা করেছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে অভিবাসী পরিবারগুলো স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা ও আবাসন সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভয় পাবে। এর প্রভাব পরিবারে থাকা মার্কিন নাগরিক শিশুদের ওপরও পড়তে পারে বলে স্থানীয় সরকারগুলোর দাবি।

নতুন নীতির সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা এসেছে নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের কাছ থেকে। ১৪ সেপ্টেম্বর দায়ের করা মামলায় তিনি ও অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, নীতিটি অভিবাসীদের বৈধভাবে পাওয়ার অধিকার থাকা খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

জেমসের বক্তব্য, এই নীতি অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে এমন ভয় তৈরি করবে যে প্রয়োজনীয় সরকারি সুবিধা নিলে ভবিষ্যতে তাদের অভিবাসন আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার ভাষায়, নতুন নিয়মটি পরিবারগুলোকে তাদের আইনগতভাবে প্রাপ্য খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা ছেড়ে দিতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।

নিউইয়র্ক সিটির করপোরেশন কাউন্সেল স্টিভ ব্যাংকস বলেন, কোনো অভিবাসীকে তার আইনগতভাবে প্রাপ্য সরকারি সুবিধা নেওয়া এবং নিজের অভিবাসন আবেদন রক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। স্থানীয় সরকারগুলোর মামলায় বলা হয়েছে, ডিএইচএস তার আইনগত ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা

সমালোচকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, নতুন নীতির কারণে অভিবাসীরা বৈধভাবে পাওয়ার যোগ্য সুবিধাও নিতে চাইবেন না। কারণ কোনো সুবিধা গ্রহণ ভবিষ্যতে তাদের গ্রিন কার্ড বা ভিসা আবেদনে নেতিবাচকভাবে বিবেচিত হবে কি না—এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নিউইয়র্কের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এরই মধ্যে কিছু পরিবার স্বাস্থ্যবীমা, খাদ্য সহায়তা ও আবাসন সুবিধা নেওয়া থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, নতুন নীতির উদ্দেশ্য অভিবাসীদের হয়রানি করা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার আগে তারা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারবেন কি না, তা নিশ্চিত করা।

প্রশাসনের যুক্তি, অভিবাসীদের সরকারি কল্যাণ কর্মসূচির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো হলে মার্কিন করদাতাদের ওপর সম্ভাব্য আর্থিক চাপও কমবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসন এই নীতিকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে, যা অ-নাগরিকদের সরকারি কল্যাণ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হতে নিরুৎসাহিত করবে।

১৮ সেপ্টেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ

মার্কিন ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত চূড়ান্ত নিয়ম অনুযায়ী, নতুন বিধান ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ওই তারিখের আগে সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলো পুরোনো ২০২২ সালের নিয়ম অনুযায়ী মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে, আর পরবর্তী আবেদনগুলো নতুন কাঠামোর আওতায় পড়বে।

তবে আদালত যদি এর আগে নতুন নিয়মের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়, তাহলে কার্যকর হওয়ার সময়সূচি বা প্রয়োগের ধরন বদলে যেতে পারে। এ কারণেই এখন অভিবাসী পরিবার, আইনজীবী ও অধিকার সংগঠনগুলোর বড় নজর ফেডারেল আদালতের দিকে।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা গ্রিন কার্ডের আবেদন করছেন বা ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করবেন, তাদের জন্য সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি এখন আরও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে নতুন নিয়মকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে সরকারি কোনো সুবিধা নিলেই একজন বাংলাদেশি অভিবাসী গ্রিন কার্ড পাবেন না। কোন সুবিধা নেওয়া হয়েছে, কে সুবিধাটি পেয়েছেন, আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা কী এবং তার অভিবাসন শ্রেণি কী—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে ইউএসসিআইএস ইতোমধ্যে নতুন নীতির বিষয়ে নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী ‘পাবলিক চার্জ’ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হবে।

নজর আদালতের আদেশের ওপর

এখন মূল প্রশ্ন—১৮ সেপ্টেম্বরের আগে আদালত নতুন নীতিতে স্থগিতাদেশ দেবে কি না। যদি আদালত স্থগিতাদেশ দেয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পথে বড় বাধা তৈরি হবে। আর যদি আদালত হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে নির্ধারিত তারিখ থেকে অভিবাসন কর্মকর্তারা আরও বিস্তৃত সরকারি সুবিধা ও আবেদনকারীর আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে পারবেন।

ফলে নতুন নীতির বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তা শুধু প্রশাসনের সিদ্ধান্তে নয়, আদালতের রায়েও নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, এটি করদাতাদের সুরক্ষা ও অভিবাসীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ; অন্যদিকে অঙ্গরাজ্য ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এটি বৈধ সুবিধা নেওয়া পরিবারগুলোকে ভয় দেখিয়ে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
 

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন