https://www.prothomalony.com/
18024
north-america
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ ১৩:২৪
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ গত ১৮ আগস্ট প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বিশাল এই অঙ্কটি সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো দূরের কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান মনে হতে পারে। কিন্তু নতুন এক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, সরকারের ঋণ বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে শিক্ষাঋণ, বাড়ির বন্ধকী ঋণ, ছোট ব্যবসার ঋণ এবং অবসরকালীন সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধায়।
দ্য কনফারেন্স বোর্ডের জননীতি বিষয়ক সংস্থা সিইও সেন্টারের নতুন মডেলিংয়ে দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে আগামী এক দশকে সাধারণ আমেরিকানদের ঋণের খরচ তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে। বিপরীতে ঘাটতি আরও বেড়ে গেলে কিংবা বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হলে একটি পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক হাজার থেকে লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ঋণের বোঝা কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে?
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণকে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু দায় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ডলার। তবে বাস্তবে প্রত্যেক নাগরিককে এই অর্থ সরাসরি পরিশোধ করতে হয় না। এর প্রভাব আসে অন্য পথে।
সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে যখন আরও বেশি বন্ড বিক্রি করে, তখন বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি সুদ দাবি করতে পারেন। সরকারি ঋণের সুদ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হারও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাঋণ, গৃহঋণ ও ব্যবসায়িক ঋণের সুদের হার অনেকাংশে ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের ঋণ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী, বাড়ি কিনতে চাওয়া পরিবার কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাওয়া উদ্যোক্তার ঋণের কিস্তিতেও পৌঁছাতে পারে।
শিক্ষার্থীর বাড়তি খরচ প্রায় ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত
একটি উদাহরণে ধরা হয়েছে, ২০২৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ে ৪৫ হাজার ডলার এবং পরবর্তী দুই বছরের উচ্চশিক্ষায় আরও ৩০ হাজার ডলার ঋণ নেবেন।
বর্তমান ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতিতে ১০ বছরের মেয়াদে তার মোট পরিশোধের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ৬৪৫ ডলার।
সরকার বাজেট ঘাটতি কমাতে সক্ষম হলে মোট খরচ কিছুটা কমে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৭৭৬ ডলারে নামতে পারে। কিন্তু ঘাটতি আরও বেড়ে গেলে তা প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৬৪৮ ডলারে উঠতে পারে।
আর ২০২৯ সালে মাত্র এক সপ্তাহের সরকারি ঋণখেলাপির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে ওই শিক্ষার্থীর মোট পরিশোধ বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৪৯৫ ডলার হতে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সুদের হার ১৯৮০-এর দশকের মতো উচ্চ পর্যায়ে উঠে গেলে মোট পরিশোধ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৩৬ ডলারে—বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় ২০ হাজার ডলার বেশি।
বাড়ি কিনতেও বাড়বে খরচ
জাতীয় ঋণের চাপ শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, বাড়ি কিনতে চাওয়া পরিবারগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
বিশ্লেষণে ৬ লাখ ডলারের একটি বাড়ি এবং ২০ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালে বাড়ি কিনলে সরকারের অপেক্ষাকৃত ভালো ও খারাপ ঋণ পরিস্থিতির মধ্যে মোট বন্ধকী ঋণ পরিশোধের ব্যবধান প্রায় ২৫ হাজার ডলার হতে পারে।
কিন্তু ২০৩৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে পরিস্থিতি আরও ব্যয়বহুল হতে পারে। ঘাটতি বেশি থাকলে একটি পরিবার বর্তমান ধারার তুলনায় প্রায় ২৪ হাজার ডলার বেশি দিতে পারে। আর বড় ধরনের সুদের হার সংকট দেখা দিলে অতিরিক্ত ব্যয় ২ লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—যা প্রায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণের চাপ একটি পরিবারের আবাসন ব্যয়ের পাশাপাশি শিশুদের দেখাশোনা ও বয়স্ক পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদি যত্নের খরচ সামলানো আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
ছোট ব্যবসাতেও বাড়বে ঋণের খরচ
ছোট ব্যবসার উদ্যোক্তারাও জাতীয় ঋণের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবেন না।
বিশ্লেষণে ২০৩১ সালে ১ লাখ ডলার এবং ২০৩৬ সালে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের দুটি ব্যবসায়িক ঋণের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ধারার পরিস্থিতিতে এই ঋণের মোট পরিশোধ প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৭ ডলার হতে পারে।
সরকার ঘাটতি কমাতে পারলে উদ্যোক্তার প্রায় ৬ হাজার ৩০০ ডলার সাশ্রয় হতে পারে। বিপরীতে ঘাটতি আরও বেড়ে গেলে অতিরিক্ত খরচ হতে পারে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ ডলার।
এক সপ্তাহের সরকারি খেলাপি হলে বাড়তি খরচ প্রায় ২০ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর চরম সুদহার সংকটে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬৫ হাজার ডলার, যা বর্তমান ধারার তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে চাপটা অন্যরকম
অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঋণের সুদের হারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। এখানে মূল উদ্বেগ সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল নিয়ে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলের রিজার্ভ ২০৩২ সালে শেষ হয়ে যেতে পারে। কংগ্রেস নতুন ব্যবস্থা না নিলে আইন অনুযায়ী তখন যে পরিমাণ বেতনভিত্তিক কর সংগ্রহ হবে, তার ওপর নির্ভর করেই সুবিধা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০৩২ সালে একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাসিক সুবিধা ২ হাজার ৪৬৬ ডলার হওয়ার কথা থাকলে তা কমে প্রায় ২ হাজার ২৯৩ ডলারে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ মাসে প্রায় ১৭৩ ডলার কম। ২০৩৬ সালের দিকে এই ব্যবধান আরও বড় হয়ে মাসে প্রায় ৭৫৪ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পুরোপুরি বজায় রাখতে সরকারকে ২০৩২ থেকে ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার সাধারণ তহবিল থেকে স্থানান্তর করতে হতে পারে। কিন্তু এতে আবার জাতীয় বাজেট ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার?
বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—জাতীয় ঋণ কোনো বিমূর্ত সংখ্যা নয়। এর প্রভাব মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।
একজন তরুণের শিক্ষাঋণের কিস্তি বাড়তে পারে। বাড়ি কিনতে চাওয়া পরিবারকে দিতে হতে পারে অতিরিক্ত সুদ। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোক্তার ঋণ ব্যয়বহুল হতে পারে। আর অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কমে যেতে পারে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা।
দ্য কনফারেন্স বোর্ডের বিশ্লেষণে আগামী দশকের জন্য পাঁচটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমান বাজেট ঘাটতির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালে জাতীয় ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৫৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে তা প্রায় ১২৬ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। বিপরীতে ঘাটতি আরও বেড়ে গেলে ঋণ জিডিপির প্রায় ১৮০ শতাংশে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে।
সামনে কী করতে পারে কংগ্রেস?
বিশ্লেষণটি জাতীয় ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে দ্বিদলীয় অর্থনৈতিক কমিশন গঠন, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অর্থায়ন সংস্কার, মেডিকেয়ার ব্যয় কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং কেন্দ্রীয় বাজেট প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছে।
মূল প্রশ্ন এখন একটাই—যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা জাতীয় ঋণের লাগাম টানতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
কারণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় থাকা একটি বিশাল সংখ্যা নয়। এর প্রভাব নির্ধারণ করতে পারে আগামী দশকে একজন শিক্ষার্থীর ঋণ কত হবে, একটি পরিবারকে বাড়ির জন্য কত টাকা দিতে হবে, একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা সম্প্রসারণ কতটা ব্যয়বহুল হবে এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি মাস শেষে কতটুকু সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা হাতে পাবেন।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন