https://www.prothomalony.com/
17785
north-america
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ ০০:১২
আমেরিকার সমাজে পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। এই দেশ বারবার নিজেকে বদলেছে—আইনে, সংস্কৃতিতে, জীবনযাপনে। কিন্তু কিছু পরিবর্তন নিঃশব্দে আসে, যার অভিঘাত বোঝা যায় অনেক পরে। গাঁজার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ঠিক তেমনই একটি পরিবর্তন। একসময় যে উদ্ভিদকে অপরাধের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, আজ সেটিই বহু অঙ্গরাজ্যে বৈধ, সহজলভ্য এবং সামাজিকভাবে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন বা প্রায় প্রতিদিন গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন নিয়মিত মদ্যপায়ীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
এই পরিবর্তনকে কেবল "ভালো" বা "খারাপ" বলে বিচার করলে ভুল হবে। বরং আমাদের জানতে হবে—কেন এমন হচ্ছে, এর প্রভাব কী এবং বিশেষ করে অভিবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এর অর্থ কী।
প্রথমেই একটি বাস্তবতা স্বীকার করা দরকার। আজকের আমেরিকায় গাঁজা আগের মতো গোপন কোনো বিষয় নয়। বহু অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসা ও বিনোদন—উভয় উদ্দেশ্যেই এর ব্যবহার বৈধ। ডিসপেনসারিগুলো এখন অনেকটা ফার্মেসির মতোই পরিচালিত হয়। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে গাঁজাকে আর নিষিদ্ধ বা ভয়ঙ্কর কিছু বলে মনে হয় না। আইন বদলালে মানুষের মনোভাবও বদলায়। সেটাই ঘটছে।
কিন্তু আইনি বৈধতা কোনো কিছুকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত করে না। অ্যালকোহল বৈধ, কিন্তু অতিরিক্ত অ্যালকোহল যে পরিবার ভাঙে, দুর্ঘটনা ঘটায় এবং স্বাস্থ্য নষ্ট করে—তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একইভাবে গাঁজাও সবার জন্য সমান নিরাপদ—এমন দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ও নিয়মিত গাঁজা ব্যবহার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কৈশোর ও তরুণ বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ চলাকালে এর প্রভাব নিয়ে চিকিৎসক ও গবেষকদের উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কারণ আমাদের পরিবারব্যবস্থা এখনো অনেকটাই মূল্যবোধকেন্দ্রিক। সন্তানদের নিয়ে বাবা-মায়ের প্রত্যাশা অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সন্তানরাই এমন একটি সমাজে বড় হচ্ছে, যেখানে গাঁজার ব্যবহার ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা এমন পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই প্রজন্মগত ব্যবধানই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, এ বিষয়ে কথা বললে সন্তান উৎসাহিত হবে। তাই নীরব থাকাই ভালো। কিন্তু বাস্তবে নীরবতা সমস্যার সমাধান নয়। বরং এতে সন্তান তথ্য সংগ্রহ করে বন্ধুদের কাছ থেকে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে, যেখানে সব তথ্য সঠিক নাও হতে পারে।
প্রয়োজন খোলামেলা আলোচনা। ভয় দেখিয়ে নয়, তথ্য দিয়ে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে। সন্তানকে বুঝতে হবে আইন কী বলছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতাও মনে রাখতে হবে। সব গাঁজা ব্যবহারকারী আসক্ত হয়ে পড়েন না। অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথা, ক্যানসারের চিকিৎসাজনিত উপসর্গ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে মেডিকেল ক্যানাবিস ব্যবহার করেন। আবার অনেকে বিনোদনের জন্য ব্যবহার করলেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। তাই বিষয়টিকে একপেশেভাবে দেখলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে।
তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, যেকোনো নেশাজাতীয় পদার্থের মতো গাঁজাও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে প্রতিদিনের ব্যবহার উদ্বেগের কারণ। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, গাঁজা ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত বা প্রায় প্রতিদিন এটি ব্যবহার করছেন। এ প্রবণতা মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং পারিবারিক সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে, তার উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তাই সতর্কতা জরুরি।
বাংলাদেশি কমিউনিটির আরেকটি দায়িত্ব রয়েছে। আমরা প্রায়ই দুটি চরম অবস্থানের একটিতে চলে যাই। হয় সবকিছুকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করি, নয়তো বলি—"এটা তো আমেরিকায় বৈধ, সমস্যা কোথায়?"—এই দুই অবস্থানের মাঝখানে যে বাস্তবতার জায়গা আছে, সেটিই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
কমিউনিটি সংগঠন, মসজিদ, মন্দির, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং বাংলা গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভীতি ছড়িয়ে নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, আসক্তি বিশেষজ্ঞ এবং জনস্বাস্থ্যবিদদের নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। তরুণদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা বিচার হওয়ার ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, কোনো সমাজের শক্তি শুধু তার আইন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; পরিমাপ করা যায় তার সচেতনতা দিয়ে। গাঁজা বৈধ কি অবৈধ—এই বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সন্তানদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলছি? আমরা কি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলাখুলি কথা বলছি? আমরা কি এমন পরিবার ও কমিউনিটি গড়ে তুলছি, যেখানে সংকটের সময় একজন তরুণ নেশার আশ্রয় নেওয়ার আগে একজন মানুষের কাছে যেতে পারে?
আমেরিকার নেশার মানচিত্র বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তন ঠেকানো হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভেতরে আমাদের কমিউনিটি কীভাবে নিজেদের মূল্যবোধ, সচেতনতা এবং পারিবারিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করবে—সেই সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই নিতে হবে। কারণ প্রতিটি সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন দায়িত্বও এসে হাজির হয়। আর সেই দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার সুযোগ নেই।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন