https://www.prothomalony.com/

12720

bangladesh

বাংলাদেশ

ঈদের বাজার: মধ্যবিত্তের জন্য যেন হাপিত্যেশের না হয়ে উঠে

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৫ ০০:৫৬

ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে খুশি ভাগাভাগি করার দিন। মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। সারা মাস সিয়াম সাধনার পর যখন ঈদের চাঁদ আকাশে ওঠে, তখন শুধু শিশুরাই নয়—প্রত্যেক মানুষের মনেই আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। কিন্তু সেই আনন্দের আবহে যখন বাজারের আগুনঝরা দাম, লাগামহীন ব্যয় আর অসহনীয় চাপ এসে ভর করে, তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছে ঈদের উৎসব ক্রমেই এক হাপিত্যেশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর কাছে ঈদের প্রস্তুতি মানেই সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ। সীমিত আয়ের মধ্যেই ঈদের পোশাক, ইফতার-সেহরির বিশেষ আয়োজন, অতিথি আপ্যায়নের খরচ—সবকিছু সামলাতে হয়। শিশুদের আবদার মেটানো, পরিবারের সবার জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা, আত্মীয়-স্বজনের জন্য উপহার কেনা—এসবের পেছনে খরচ করতে গিয়ে প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে প্রতি মুহূর্তে হিসাব মেলাতে হয়। কিন্তু বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সেই হিসাবের খাতা ভারী করে তোলে।

এখন বাজারে ঢুকলেই দেখা যায় প্রতিটি পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম। গরুর মাংস, মুরগি, ডাল, চিনি, দুধসহ সব খাদ্যপণ্যের দাম আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। ঈদের সময় পোশাকের দোকানগুলোতেও চলে অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। সাধারণ একটি পোশাকের দামও এমন পর্যায়ে চলে যায় যে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা শুধু তাকিয়ে দেখে, কিন্তু কেনার সাহস পান না।

বড় সমস্যা হলো, মধ্যবিত্তরা কারও কাছে গিয়ে নিজেদের দুরবস্থার কথা বলতে পারেন না। নিম্নবিত্তরা যেভাবে ত্রাণ পায়, সহায়তা পায়—মধ্যবিত্তরা সেটাও পান না, আবার কষ্ট গোপন রাখার এক অলিখিত নিয়ম মেনে চলেন। তারা হাত পাততে চান না, লজ্জায় অনেক সুযোগ-সুবিধা নিতেও সংকোচ করেন। অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবনে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়, যার ফলে ঈদের বাজার করতে গিয়ে তারা নিজেদের চাহিদা ও সাধ্যের মধ্যে দূরত্ব টের পান।

এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো বাজার নিয়ন্ত্রণের অভাব। প্রতি বছরই ঈদের আগে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা—এসব যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারের মনিটরিং দল বাজারে নামলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, এসব অরাজকতার শিকার হন।

এ সমস্যা থেকে বের হতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং কঠোর নজরদারি। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, তার বাস্তবায়নও জরুরি।

এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। অনেক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি ঈদের আগে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের বাজারের ব্যবস্থা করেন, তাহলে সেটি এই শ্রেণির মানুষদের কিছুটা স্বস্তি দেবে।

সবচেয়ে বড় কথা, উৎসবের আনন্দ যেন সবার হয়। শুধুমাত্র বিত্তবানদের জন্য ঈদ নয়। মধ্যবিত্তদেরও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অধিকার আছে। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য বাজারের দরজা উন্মুক্ত করতে হবে। ঈদের বাজার যেন মধ্যবিত্তের জন্য এক হাপিত্যেশের কারণ না হয়ে, বরং সত্যিকারের আনন্দ আর উৎসবের প্রতিফলন ঘটায়—এটাই সকলের কাম্য।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন