https://www.prothomalony.com/
18221
north-america
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:২৮
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় বিশ্বনেতাদের সমর্থন চাইলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩৮ মিনিটের ভাষণে তিনি সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করার আভাস দিয়ে বলেন, দরকার হলে তিনি ইরানকে ‘নরকে পাঠিয়ে দেবেন’।
২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় বিদেশি কূটনীতিকদের করতালি পান তিনি। নিজের কথায় তিনি বলেন, তিনি ‘বছরের পর বছরের অসমাপ্ত কাজ মিটিয়ে ফেলছেন’।
“আমার সামনে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যা তাদের পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের, এমনকি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি দেশে পরিণত হওয়ার পথ খুলে দেবে?” প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। এরপরই তিনি যোগ করেন, “নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে দেব দ্রুতগতিতে, যাতে তারা আর কখনো মানুষ আর দেশ ধ্বংস করার সুযোগ না পায়? আমি কি তাদের কোনো বেঁচে থাকার সুযোগ না দিয়ে নরকে ঠেলে দেব?”
এই মন্তব্যের পরপরই সম্মেলনকক্ষ ত্যাগ করেন ইরান ও কিউবার প্রতিনিধিরা। ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার সময় ইরানের প্রতিনিধি দলের আসনগুলো ফাঁকা দেখা যায়।
দিনের পর দিন সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প, কারণ শান্তি আলোচনা থমকে আছে। জাতিসংঘে তিনি জানান, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তেহরানের অবস্থান বদলাবে বলে তাঁর ধারণা।
“নির্বাচনের পরপরই আমরা একটা চুক্তিতে পৌঁছাব বলে আমার বিশ্বাস, কারণ তাদের জন্য চুক্তি না করাটা অর্থহীন। তারা অপেক্ষা করছে দেখার জন্য যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমি কেমন করি। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না, আমি নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছি না,” বলেন ট্রাম্প। তিনি যোগ করেন, রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে লড়ছে, আর তিনি তাদের সহায়তা করবেন—যদিও তিনি নিজেই দলীয় ভোটারদের এমনভাবে ভোট দিতে উৎসাহ দিচ্ছেন যেন তিনিই প্রার্থী।
“ইরানের ব্যাপারে নির্বাচনকে আমি কোনো গুরুত্বই দিই না, দেবও না। এটা আমার মাথায়ই আসে না। একমাত্র যে বিষয়টা মাথায় আসে তা হলো, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না,” সম্মেলনকক্ষের করতালির মধ্যে বলেন তিনি।
তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির চেষ্টার পরই এই সংঘাতকে ‘অনিবার্য’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমরা বছরের পর বছরের অসমাপ্ত কাজ মেটাচ্ছি, আর তা ভালোভাবেই করছি। সন্ত্রাসের এক নম্বর পৃষ্ঠপোষক, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের চেয়ে বড় কোনো উদাহরণ নেই, যেখানে বিশ্বের ঝুঁকির মুখে একটা বিপদকে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুদ্ধবিরতির পরও পারমাণবিক আলোচনার মধ্যে ইরান বেসামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তা লঙ্ঘন করেছে।
বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটের প্রশংসা করেন ট্রাম্প। এরপর তিনি সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদ সংকট নিয়ে সমালোচনাকারীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তাঁর ভাষায়, “কাপুরুষ আর বিশ্বাসঘাতকেরা বলতে ভালোবাসে যে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ কমে যাচ্ছে, কিন্তু এটা সত্য নয়। বিশাল গোলাবারুদ কারখানা খোলা হচ্ছে—আঠারোটি এমন কারখানা নির্মাণাধীন।”
সব দেশকে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি, যতক্ষণ না দেশটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করে, পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ ত্যাগ করে এবং সন্ত্রাসে মদদ বন্ধ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানানো আগের বক্তাদের জবাবে ট্রাম্প বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে কোনো ‘গ্লোবালিস্ট পরিকল্পনা’ যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। তাঁর ভাষায়, “শিল্পবিপ্লবের চেয়েও, এমনকি ইন্টারনেটের চেয়েও বড় কিছু হয়ে উঠতে যাচ্ছে যা—আমি তার প্রবৃদ্ধি রুদ্ধ করব না।” বিচার বিভাগ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিষয়টি ‘নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ’ করবে জানালেও, কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্রমবর্ধমান দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
জাতিসংঘকে ‘বৈশ্বিক সরকার’ বলার ধারণাকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, বিশ্বব্যাপী কার্বন কর প্রবর্তনের একটি গোপন উদ্যোগ ঠেকাতে তাঁর প্রশাসনকে গত বছর হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, “কোনো বৈশ্বিক সরকার নেই, আর আমি যতদিন প্রেসিডেন্ট থাকব, ততদিন কোনো বৈশ্বিক কর হবে না।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কড়া সমালোচনা করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষ নিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্যদের কখনোই এই ‘বিচারব্যবস্থাহীন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আদালতের’ তদন্তের মুখে পড়তে দেওয়া হবে না। আইসিসির সদস্য দেশগুলোকে অবিলম্বে সংস্থাটি ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মানবাধিকার পরিষদকেও ‘ভণ্ড’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে খ্রিষ্টানদের নিপীড়ন নিয়ে সংস্থাটির নীরবতা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ ছাড়া ইউনেস্কোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার নামে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি অভিবাসন উৎসাহিত করে আসলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতিগুলোকেই ধ্বংস করছে। তাঁর ভাষায়, “অবৈধ অভিবাসনের কোনো মানবাধিকার নেই, কিন্তু সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার অধিকার আছে।”
ভাষণে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর নতুন চুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শেয়ারবাজারের রেকর্ড এবং জানুয়ারির অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতের বিষয়েও গর্ব প্রকাশ করেন ট্রাম্প। কিউবার কমিউনিস্ট সরকারও শিগগির পতনের মুখে পড়বে বলে পূর্বাভাস দেন তিনি।
“আমরা সিদ্ধান্তমূলকভাবে ও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্ব-পরিস্থিতি নতুন করে সাজিয়েছি এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান করেছি,” দাবি করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমেরিকা ফিরে এসেছে, এবং আমাদের দেশ আগের চেয়ে শক্তিশালী।”
অনুষ্ঠানে পৌঁছেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে কৌতুক করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস কর্তৃক সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের নিষিদ্ধ করার জেরে শুরু হওয়া পাঁচ নেটওয়ার্কের টিভি বয়কটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সম্মানের বিষয় যে আজ এখানে আছি। আমি অবাক, সিএনএন আমাকে কাভার করতে এসেছে। তোমাদের এখানে থাকার কথাই নয়।”
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন