https://www.prothomalony.com/
18142
north-america
জাতিসংঘের ইতিহাসে বাংলাদেশের উপস্থিতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশ্ব সংস্থার সদস্য হওয়ায় পর থেকেই এই বৃহৎ মঞ্চে বাংলাদেশ তার কথা বলেছে, নিজের স্বার্থের কথা বলেছে, উন্নয়নশীল বিশ্বের কথা বলেছে, শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেছে। কিন্তু এবারের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটু আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।
কারণ, একই অধিবেশনে বাংলাদেশের দুজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দুই ভিন্ন ভূমিকায় বিশ্বমঞ্চে থাকছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে আসছেন। আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ইতোমধ্যে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে এই পদে নির্বাচিত হন। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ৮১তম অধিবেশন, যার এবারের প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All.”
একজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের কথা বলবেন, অন্যজন ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাজ পরিচালনা করবেন। একই সময়ে একই মঞ্চে বাংলাদেশের দুই প্রতিনিধির এমন উপস্থিতি নিছক প্রটোকলের বিষয় নয়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত।
ইতিহাসের প্রতীক যতই সুন্দর হোক, রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি প্রতীকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। দাঁড়ায় প্রস্তুতি, প্রজ্ঞা, বাস্তবতা এবং ধারাবাহিকতার ওপর।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে তখনকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, উন্নয়ন, দারিদ্র্য এবং নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি বৃহৎ শক্তিগুলোর অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমিয়ে উন্নয়নের জন্য সম্পদ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ছেচল্লিশ বছর পর তাঁরই পুত্র যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়াবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের একটি সেতুবন্ধন তৈরি হবে। রাজনীতিতে প্রতীকের মূল্য আছে। কিন্তু সেই প্রতীককে অর্থবহ করে তুলতে হলে বর্তমানের বাস্তব সমস্যাগুলোর সামনে দাঁড়াতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।রোহিঙ্গা সংকট তার মধ্যে অন্যতম। বছরের পর বছর ধরে এই সংকট ঝুলে আছে। মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। জাতিসংঘের মতো মঞ্চে বাংলাদেশকে এই সংকটের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আরও জোরালোভাবে তুলতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরের আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়। এটি নদীভাঙন, উপকূলীয় মানুষের বাস্তুচ্যুতি, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জলবায়ু তহবিলে ন্যায্য হিস্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন বাংলাদেশের কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।
এর সঙ্গে আছে বৈশ্বিক বাণিজ্য, শুল্ক, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। একটি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করা যায়, সেটিও এই সফরের আলোচনার অংশ হওয়া দরকার।
ড. খলিলুর রহমানের উপস্থিতি এই আলোচনাকে আরেকটি মাত্রা দিয়েছে। জাতিসংঘের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিউইয়র্ক ও জেনেভায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর কাজ কেবল বাংলাদেশের স্বার্থ দেখা নয়। তাঁকে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে সমন্বয়, আলোচনা ও ঐকমত্য তৈরির কাজও করতে হবে। তিনি নিজেই নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছিলেন, তিনি “সবার সভাপতি” হিসেবে কাজ করতে চান এবং মতপার্থক্য অস্বীকার না করে অভিন্ন ভিত্তি খুঁজবেন।
এখানেই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতিনিধি। কিন্তু সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁকে একই সঙ্গে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় তাঁর নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের সাবেক সাধারণ পরিষদ সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকও তাঁর নির্বাচনের পর এই দায়িত্বের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
নিউইয়র্ক সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ। ২৫ সেপ্টেম্বরের নাগরিক সংবর্ধনা। এটিকে একটি রাজনৈতিক সমাবেশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রেমিট্যান্স পাঠানো থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সংকটে পাশে দাঁড়ানো—প্রবাসীরা বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল আবেগে নয়, বাস্তব কাজেও প্রমাণ করেছেন। প্রবাসীরা শুধু করতালি দিতে আসবেন না।
তাঁদের প্রশ্ন আছে। নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, দ্বৈত কর নিয়ে প্রশ্ন আছে, দেশে সম্পদ ও ব্যবসা পরিচালনার নানা জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। দেশের রাজনীতির সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্কও বহুদিনের। ফলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই নাগরিক সংবর্ধনা হবে শুধু বক্তব্য দেওয়ার জায়গা নয়, শোনারও একটি সুযোগ।আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী সেই শোনার মানসিকতা নিয়েই প্রবাসীদের সামনে দাঁড়াবেন।
অবশ্য নিউইয়র্কের রাজপথও এই সফরের সময় নীরব থাকবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন প্রবাসেও দেখা যাবে। আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের উপস্থিতি, কর্মসূচি কিংবা প্রতিবাদ—সবই নিউইয়র্কের গণতান্ত্রিক পরিসরের অংশ হিসেবে সামনে আসতে পারে। দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমনই হোক, নিউইয়র্কের রাজপথে মতপ্রকাশের অধিকার তার নিজস্ব আইনি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে। এসব কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি সময়ই বলবে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—জাতিসংঘের করিডোরে বাংলাদেশের অবস্থান কোনো একক সরকার, দল বা ব্যক্তির অর্জন নয়। এটি বহু দশকের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার ফল। সরকার এসেছে, সরকার গেছে; কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত থেকেছে।
আজ সেই ধারাবাহিকতার একটি নতুন অধ্যায় সামনে।
বাংলাদেশের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আসছেন বিশ্বমঞ্চে দেশের কথা বলতে। এই দৃশ্য আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু গর্বের সঙ্গে দায়িত্বও আসে।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পতাকা যত উঁচুতেই উঠুক, শেষ পর্যন্ত তার মূল্যায়ন হবে কী বলা হলো, কী অর্জন হলো এবং দেশের মানুষের জন্য তার ফল কী দাঁড়াল—তার ভিত্তিতে।
আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর প্রটোকলের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের স্বার্থের একটি কার্যকর কূটনৈতিক অভিযাত্রায় পরিণত হোক। রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং বৈশ্বিক শান্তি—প্রতিটি প্রশ্নেই বাংলাদেশ যেন নিজের অবস্থান স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতে পারে।
নিউইয়র্ক প্রস্তুত।
জাতিসংঘ প্রস্তুত।
প্রবাসী বাংলাদেশিরাও অপেক্ষায়।এখন অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীর পদধ্বনির।
প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিউইয়র্কে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা।
বাংলাদেশের জন্য এটি যেন শুধু একটি ঐতিহাসিক ছবি হয়ে না থাকে—হয়ে ওঠে একটি অর্থবহ কূটনৈতিক অর্জনের সূচনা।
নিউইয়র্কে স্বাগতম, প্রধানমন্ত্রী।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন