https://www.prothomalony.com/

18132

photo

ছবি

ভাগীরথী নদীর তীরে

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৩৭

সেই ভাগীরথী নদী ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী হয়ে আজও বয়ে চলেছে। বর্ষায় উত্তাল নদীর উন্মাদনা আর অদম্য স্রোতধারায় এ পাড় ও পাড় ভেঙে শত শত বছরের কত স্মৃতি, কত স্থাপনা, প্রাসাদ অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছে! অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজধানী মুর্শিদাবাদ। ১৭০৪ সালে বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে (তৎকালীন মাকসুদাবাদ) স্থানান্তর করেন। তার নামানুসারেই এই শহরের নামকরণ করা হয় মুর্শিদাবাদ। পরবর্তীতে ১৭১৭ সালে তিনি বাংলার নবাব হিসেবে দায়িত্ব নিলে (১ম স্বাধীন নবাব) মুর্শিদাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মুর্শিদাবাদের কত উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী এ ভাগীরথী নদী।

নবাব আলীবর্দী খানের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তার তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন তার বড় ভাই মির্জা হাজী আহমদ খানের তিন পুত্রের সাথে। বড় মেয়ে মেহেরুন্নেছা খানম ঘসেটি বেগমের স্বামী নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান, মেজ মেয়ের স্বামী সৈয়দ আহমদ খান আর ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের স্বামী জয়নুদ্দীন আহমদ খান—যাদের ছোট ছেলে সিরাজ, ছোট ভাই ইকরামউদ্দৌলা ও এক বোন। ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের ঘরে সিরাজের জন্মের সাথে সাথে পাটনার শাসনভার আলীবর্দী খানের হাতে আসে। তাই মির্জা মোহাম্মদ সিরাজকে সৌভাগ্যের কারণ মনে করতেন। তাকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন আলীবর্দী খান। মির্জা মেহেদী বা ইকরামউদ্দৌলাকে আবার দত্তক নিয়েছিলেন ঘসেটি বেগম। নবাবের বাবার নাম শাহ কুলী খান (মির্জা মোহাম্মদ মাদানী)।

১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে জহির উদ্দীন মুহাম্মদ বাবর ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় তিন শতাব্দী ধরে বিস্তৃত এই শাসনকাল (১৫২৬-১৮৫৭) উপমহাদেশে এক অখণ্ড রাজনৈতিক ঐক্য, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং পারসিক ও ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি করে। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় বাংলার রাজধানী ছিল বিহারের রাজমহল। ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম খান চিশতীকে সম্রাট জাহাঙ্গীর রাজমহলের সুবেদার নিয়োগ করেন। তিনি ১৬১০ সালে ঢাকা বিজয় করেন। এখানে উল্লেখ্য যে বারো ভূঁইয়ার শাসনের সময় বাংলার প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল সোনারগাঁও। দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে ইসলাম খান চিশতী মুসা খাঁকে হত্যা করার মাধ্যমে বারো ভূঁইয়ার জমিদারি শাসনের অবসান ঘটান। বর্তমান চট্টগ্রামের কিছু অংশ বাদে পুরো সুবে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

মুসলিম মুঘল শাসনামলেও ভারতবর্ষে মানুষ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করত। অনেক হিন্দু জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তিবর্গ রাজকর্মচারী ছিলেন। একজন গবেষক, লেখক, সংস্কৃতিমনা বিশেষ করে সিরাজ-গবেষক হিসেবে পরিচিত সমর্পিতা সিরাজ (সমর্পিতা দত্ত) সংগীত চ্যানেলের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “ভারতবর্ষ কারো একা বাপের দেশ নয়, এটা হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ সকল ধর্মের মানুষের সকলের। এটাকে কখনো হিন্দু রাষ্ট্র বানানো যাবে না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যত বজায় থাকবে, ততই মঙ্গল।”

১৭৪৬ সালে আলীবর্দী খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে সাহসী কিশোর সিরাজ তার সঙ্গী হন। পরবর্তীতে ১৭ বছর বয়সী সিরাজ পাটনায় রাজপ্রতিনিধি জানকীরামের সাথে বিদ্রোহ করে বসলে নবাব আলীবর্দী খান দ্রুত পাটনায় পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেন। বিদ্রোহ ছেড়ে সিরাজ আত্মসমর্পণ করলেন এবং ক্ষমাপ্রাপ্ত হলেন। প্রিয় দৌহিত্র সিরাজকে একটু ধৈর্য ধরে ফিরে যেতে বললেন, “তোমার জন্য বাংলার মসনদ অপেক্ষা করছে।” এবং সেখানেই দরবারকক্ষে প্রিয় নাতিকে পাশে বসিয়ে ঘোষণা দিলেন তার পরে বংশের উত্তরসূরি মির্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা হবেন বাংলা, বিহার ও ওড়িশার নবাব। কিন্তু এ ঘোষণা সিরাজের জন্য সৌভাগ্যের চেয়ে কাল হয়ে দাঁড়ায়। এবং আত্মীয় অনেকে বিশেষ করে সিরাজের খালা ঘসেটি বেগম এবং তার স্বামী নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান মেনে নিতে পারেননি।

ঘসেটি বেগম নাকি খুবই রাজনীতি-সচেতন, কূটকৌশলী ও সাহসী নারী ছিলেন। পুরুষ হলে তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকার দাবি করতেন অনায়াসে।

ঢাকার নায়েবে নাজিম নওয়াজিশ মুহাম্মদের পরম বন্ধু ছিলেন হোসেন কুলি খাঁ ও রাজা রাজবল্লভ। হোসেন কুলি খাঁ তার ধনভান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। পারিবারিক এক বিরোধের জের ধরে হোসেন কুলি খাঁর মৃত্যু হলে রাজবল্লভ কিছুটা ভীত হয়ে পড়েন। সে অন্য ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা করছিল। মির্জা মেহেদীর (ঘসেটি বেগমের পালিত পুত্র) অল্প বয়সী ছেলেকে মসনদে বসিয়ে ঘসেটি বেগমের মাধ্যমে রাজ্য চালাবে। রাজবল্লভ তার ছেলে কৃষ্ণদাসের মাধ্যমে ঢাকার রাজকোষের সকল অর্থ ও ধনভান্ডার ঘসেটি বেগমকে সাহায্যের জন্য কলকাতার ইংরেজ বণিকদের আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেন।

১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল নবাব আলীবর্দী খান মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় চারদিকে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও কঠিন ষড়যন্ত্র চলছিল। নবাবের অনুমতি না নিয়েই ইংরেজরা কলকাতার দুর্গ সংস্কার শুরু করে। এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মাঝে সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল মাত্র তেইশ বছর বয়সে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার মসনদে আরোহণ করেন। নবাব সিরাজ শক্ত হাতে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে থাকেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, চুরি-লুট এবং বিনা অনুমতিতে দুর্গ তৈরি ও মেরামত ইত্যাদি কারণে নবাব সিরাজের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ায়। তুমুল যুদ্ধ করে কলকাতা দুর্গ উদ্ধার, কাশিমবাজার দুর্গ আক্রমণ, গৃহবিবাদ-ষড়যন্ত্র স্তব্ধ করতে মতিঝিল প্রাসাদ অবরোধ করে নিজ খালা ঘসেটি বেগমকে মনসুরগঞ্জ বা হীরাঝিল প্রাসাদে গৃহবন্দী, মন্ত্রী-সেনাপতিদের ইংরেজদের সাথে দুরভিসন্ধির কারণে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ষড়যন্ত্রকারীরা ভীত হয়ে পড়ে। ধনকুবের জগৎশেঠ (মাহতাব চাঁদ) যাকে বাংলার ব্যাংক বলা হতো, এ জগৎশেঠ, উমিচাঁদ (সুদ ব্যবসায়ী), সিপাহসালার মীর জাফররা ইংরেজদের সাথে আঁতাত করে সিরাজের বিরুদ্ধে কাঠগোলা বাগানবাড়িতে ছদ্মবেশে মিলিত হয়ে গোপন বৈঠক করেছিল। সিরাজ হঠানোর গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সেই পলাশী ট্র্যাজেডি, বাংলার ইতিহাসের হৃদয়বিদারক দৃশ্যপট, বাংলা, বিহার ও ওড়িশার স্বাধীনতার শেষ সূর্য অস্তমিত হওয়ার সর্বনাশা মুহূর্ত—বিকেল পাঁচটা। এ যুদ্ধ শুধু ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ছিল না; ছিল মসনদলোভী, অর্থলোভী, আধিপত্যবাদ ও শোষক ব্যবসায়ী উমিচাঁদ, জগৎশেঠ (মাহতাব চাঁদ), মীর জাফর গংদের বিরুদ্ধে; প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে। এখানে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিরোধ পরিলক্ষিত নয়। মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ, রাজা রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণদাস ও জগৎশেঠদের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতায় রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী মাত্র ৩-৪ হাজার সৈন্য নিয়ে পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হয়। শক্তিশালী বিশাল নবাব বাহিনীর সাথে যুদ্ধজয় দূরের কথা, যুদ্ধে দাঁড়ানোরই সাহস পেত না। আসলে বলতে গেলে কোনো বড় যুদ্ধ ছাড়া নবাবের এ অসহায় পরাজয়ের পর ভারতবর্ষে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সূচিত হয়েছিল। সিরাজের বিশ্বস্ত মীর মদন ও মোহনলাল প্রাণপণ চেষ্টা করেও পরাজয় ঠেকাতে পারলেন না। মীর জাফররা বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষায় উটের পিঠে চড়ে মুর্শিদাবাদ চলে এলেন। কিন্তু তিনি ধনরত্ন বিলিয়ে দিয়েও সৈন্য সংগ্রহ করতে পারলেন না।

তবে ষড়যন্ত্রকারীদের, বিশ্বাসঘাতকদের প্রত্যেকেরই করুণ পরিণতি হয়েছিল। ইংরেজরা কাউকে শেষ রক্ষা করেনি। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। মীর জাফরকে পুতুল নবাব বানিয়ে ধীরে ধীরে সকল ক্ষমতার অধিকারী হয়। সুচতুর রবার্ট ক্লাইভ শুধু নবাব বদলায়নি, শাসনভার গ্রহণ করে। জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেও সময় যে শেষ! কেউ উন্মাদ, কেউ পাগল, কুষ্ঠরোগী, নৌকাডুবি, বজ্রাঘাত বা ইংরেজদের হাতে করুণ মৃত্যুর শিকার হয়।
 

ছবি থেকে আরো পড়ুন