https://www.prothomalony.com/
17167
photo
আমার সঙ্গে এই বইমেলার সরাসরি সম্পর্ক দুই দশকের। প্রথম যখন দেখা-সাক্ষাৎ হয় তখন সে টিনএইজের কিশোর বা কিশোরী! যদিও জন্মের পর থেকেই তার কথা শুনে আসছিলাম, আস্তে আস্তে তার বড় হওয়া উপলব্ধি করছিলাম। কিন্তু উপস্থিত হওয়া হয়েছিল তার ১৫তম জন্মবার্ষিকীতে ২০০৬ সালে। সে এক মহা উত্তেজনা ও আনন্দের অভিজ্ঞতা ছিল। জীবনের প্রথম উত্তর আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলাম নিউ ইয়র্ক বইমেলার উছিলায়। আমেরিকার ভিসাও পেয়েছিলাম নিউইয়র্ক বইমেলার আমন্ত্রণপত্র জমা দিয়ে। যদিও ভিসা ইস্যু হয়েছিল আগের বছর কিন্তু তখন আর নিউইয়র্ক যাওয়া হয়নি। আরও আগেই দেখা হওয়ার কথা ছিল আমাদের। আমার যতদূর মনে পড়ে বিশ্বজিত দা (বিশ্বজিত সাহা) ঢাকার প্রকাশকদের প্রথম থেকেই এই বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাইতেন। প্রতি বছর বইমেলা আয়োজনের আগে যোগাযোগ করতেন। তখনকার যোগাযোগ মানে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে চিঠি প্রেরণ এবং বিটিসিএল-এর ল্যান্ড ফোনের মাধ্যমে ট্রাংক কলে কথা বলা। প্রথমটি সময়সাপেক্ষ এবং দ্বিতীয়টি ব্যয়সাপেক্ষ। তারপরও বিশ্বজিত দা যোগাযোগ করতেন। এর মধ্যেই একদিন শুনতে পেলাম তিনি ঢাকায় এসেছেন এবং আমাদের সঙ্গে বসতে চান। যেদিন বসলাম, সেদিন তার মুখ থেকে শুনলাম, আমেরিকান পাসপোর্ট হাতে পেয়েই নেক্সট এভেইলেবল ফ্লাইট ধরে ঢাকা এসেছেন। দেশের জন্য তার মন খুব পুড়ছিল। ঘটনাটা ২০০০ সালের কাছাকাছি কোনো সময়ের।
সে দফায় তার সঙ্গে আলাপ করায় আমাদের মধ্যে নিউইয়র্ক বইমেলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। ২০০২ সালের একটা ঘটনা আমার খুব মনে আছে। শুনতে পেলাম বিশ্বজিত দা আমেরিকা থেকে ঢাকায় আসা একজনের হাতে লেখক-প্রকাশকদের জন্য বেশ কয়েকটি আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছেন। কিন্তু কোথায় ওই আমন্ত্রণপত্র? কীভাবে পাওয়া যাবে? যার নাম বলা হয়েছে সে বলে তার কাছে আমন্ত্রণপত্র আসেনি। যোগাযোগের এক পর্যায়ে জানা গেল প্রথম যার নাম শুনেছিলাম তার কাছেই আমন্ত্রণপত্রগুলো আছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে আমাদের আমন্ত্রণপত্রগুলো সময়মতো দেয়নি এজন্যে যে সে এবং তার এক লেখকের ভিসার জন্য আবেদন করা হয়েছে। একই অনুষ্ঠানে এত লোকের ভিসা যদি ইস্যু না করা হয়, তাই নিজেদের ভিসা ইস্যু হওয়ার পর স্বীকার করল যে তার কাছেই আমন্ত্রণপত্রগুলো আছে। এবং সে আমাদেরগুলো হস্তান্তর করল। আমি আর মনিরুল হক একত্রে জমা দিলাম। ইন্টারভিউয়ের তারিখ হলো, আমরা গেলাম, ভিসা অফিসার বললেন, তোমাদের হাতে তো সময় নেই। ভিসা প্রসেসিং, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ইত্যাদি করতে অনেক সময় লাগবে, এরমধ্যে তো বইমেলা শেষ হয়ে যাবে। তারপরও কি তোমরা যেতে চাও? আমি সরাসরি বলেছিলাম, না, যেতে চাই না। তরুণ অফিসার আমার হাতে পাসপোর্ট ফেরৎ দিয়ে বাই বলে বিদায় জানালো। মনিরুল হকের ক্ষেত্রেও একই দিনে একই ঘটনা ঘটল।
ঠিক করেছিলাম, আমেরিকাতেই যাবো না কিন্তু বিশ্বজিত দা’র আন্তরিকতায় আবার ভিসার জন্য আবেদন জমা দিলাম ২০০৫ সালে। এবার অনেক লেখক ও প্রকাশকের জন্য আমন্ত্রণপত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং প্রায় সবাই জমা দিয়েছে। যথা সময়ে আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাক পড়ল। তখন একটা কথা খুব শোনা যেত, আমেরিকার ভিসা ইস্যু হয় আবেদনকারীর ব্যাংক ব্যালেন্স এবং সম্পদ বিবরণী দেখে। ভিসা অফিসার বুঝতে চান, যাকে ভিসা দিচ্ছেন, তিনি নিজ দেশে ফিরে আসবেন তো! কেন ফিরবেন? স্বপ্নের আমেরিকা ছেড়ে স্বদেশে ফিরে আসার মতো যথেষ্ট পিছুটান তার আছে কি? একারণে যারা আমেরিকা যেতে চায় তারা আবেদনপত্রের সঙ্গে ব্যাংক একাউন্ট স্টেটমেন্ট জমা দেয়। তার আগে নিশ্চিত করে যে তার একাউন্টে বিশাল অঙ্কের অর্থ জমা আছে। এর অতিরিক্ত হিসেবে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সময় নিজেরসহ চৌদ্দগোষ্ঠীর সহায়-সম্পদের দলিলপত্র বোঝাই বিশাল ফাইল বগলদাবা করে নিয়ে যায়। আমার এসব টেনশন ছিল না। দিলে দেবে, না দিলে না করে দেবে!
অ্যাম্বাসির যে জানালায় আমার ডাক পড়ল তার ওপাশে যে তরুণ অফিসার দাঁড়িয়েছিল, সে কিছু কথাবার্তার পর আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলো যেখানে লেখা ছিল, ‘ইউএস সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের জন্য তোমার কাগজপত্র প্রেরণ করা হবে। চেক-আপ সম্পন্ন হয়ে এলে তোমাকে ডাকা হবে। এই চেক-আপ সম্পন্ন হতে তিন মাসের মতো সময় লাগতে পারে।’ যতদূর মনে পড়ছে, সম্ভবত এধরনের কথাবার্তাই লেখা ছিল। ২০০২ সালের মতো একই চক্করে ফেঁসে গেলাম। দুই-তিন মাস পর ডেকে বলবে, ‘তোমার হাতে তো সময় নেই, বইমেলা তো হয়ে গেছে, তুমি কি তবুও যেতে চাও?’ আমি বলব, ‘না, যেতে চাই না।’ সে বলবে, ‘গুড বাই’। এবার তা হলো না কিন্তু আমার মন ভেঙে গেল, সিদ্ধান্ত নিলাম আমেরিকা বাদ, ইউকে যাবো। ভিসার আবেদন করলাম স্ত্রীসহ। খুব অল্প সময়ে ভিসা পেয়ে গেলাম, লন্ডন যাতায়াতের টিকিট ক্রয় করে যাত্রা প্রস্তুতি শুরু করলাম। এর মধ্যেই ফোন এলো, ‘তোমার পাসপোর্ট নিয়ে আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে দেখা করো!’ মহা যন্ত্রণা, সে আর এক মহাকাব্য যা অন্য কোনো লেখায় লিখব। কিন্তু ২০০৫ সালেও আমেরিকা যাওয়া হলো না, ইউকে’র টিকিটের সদ্ব্যবহার করলাম।। অবশেষে যাওয়া হলো ২০০৬ সালে।
‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেলাম নিউইয়র্ক বইমেলার। বলতে দ্বিধা নেই বইমেলার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজিত দা, রুমা ভাবীর প্রেমেও পড়ে গেলাম। শুধু আমি নই, আমার স্ত্রী তানি আহমেদ, লেখক আনিসুল হক এবং প্রকাশক মনিরুল হক আমরা সবাই মুগ্ধ হয়েছিলাম বইমেলায় এবং হোস্টের আতিথেয়তায়। ছোট আয়োজনে আন্তরিকতা থাকে বেশি প্রবাদ নয়, সত্য! এর অভিজ্ঞতা আমাদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এর পর আরও অন্তত অর্ধ ডজন বার এই বইমেলায় গিয়েছি। আন্তরিকতা পাইনি তা বলছি না, কিন্তু প্রথমবারের ভালোবাসা এখনো ভুলতে পারি না।
নিউইয়র্ক বইমেলা কৈশোরকাল অতিক্রম করে ২০০৭ সালে ‘বাঙলা উৎসব’ সাবটাইটেল যুক্ত হয়ে কলেবরে বৃদ্ধি পায়। আরও একটু বয়স বৃদ্ধিতে আরও পোক্ত হয়ে নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলায় পরিণত হয়। এখন এই বইমেলা পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক, সমৃদ্ধ, পূর্ণাঙ্গ এক বইমেলা। সারা বিশ্বের বাঙালি বা বাংলাদেশিদের আয়োজিত যেকোনো উৎসবের মধ্যে অন্যতম এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই প্রাপ্তি শুধু নিউইয়র্ক বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের বা নিউইয়র্কবাসী বা আমেরিকানদের নিজস্ব নয়। এই উৎসব এখন সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের। এই গর্ব এখন আমাদের সকল বাঙালির।
প্রথম প্রজন্মের আমেরিকান বাংলাদেশি যুগলের যে সন্তান ওখানে জন্মেছে সে জন্মের পর থেকে এই বইমেলা দেখে দেখে বড় হয়েছে। তার মধ্যে বাংলা বই এবং বাংলা সংস্কৃতির বীজ বপনে এই বইমেলা নিশ্চয়ই বড় ভূমিকা রেখেছে। এভাবে অনেক প্রবাসী বাঙালির মধ্যে বাঙালিত্ব বিরাজ করার পেছনে বইমেলার বড় অবদান রয়েছে। নিউইয়র্ক বইমেলার সঙ্গে সঙ্গে বড় হওয়া শিশুটি আজ বইমেলার সম-বয়সী যার হৃদয়ে বিরাজ করছে বাংলা সংস্কৃতি। সে ভালোবাসতে শিখেছে বাংলা বই। বিগত দুইটা ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ‘অমর একুশে বইমেলা’ যেভাবে নিজের জৌলুস হারিয়েছে, তা দেখে নিউইয়র্ক বইমেলার জন্য অনেক বেশি গর্ব করতে ইচ্ছা হয়। কেননা এই বইমেলা দিন দিন তার জৌলুস বৃদ্ধি করছে, এর ঔজ্জ্বল্য বাড়ছে, কলেবর এবং ব্যাপ্তি প্রসারিত হচ্ছে।
এই বইমেলার আর একটা উপকারিতা উল্লেখ না করলে লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। প্রথম দিকে খুব কম প্রকাশক বইমেলায় অংশগ্রহণ করলেও দিন দিন এই অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০০৬ সালে আমি যেবার প্রথম অংশগ্রহণ করি সেবার ‘সময় প্রকাশন’ আর ‘অনন্যা’ সরাসরি ঢাকা থেকে গিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল। ২০০৭ সালেই অনেক নতুন মুখ দেখেছিলাম! ২০০৮ সালে আরও কিছু যোগ হয়েছিল! এর পর প্রকাশকের সংখ্যা শুধু বৃদ্ধিই পেয়েছে। অনেক লেখক বইমেলার উদ্দেশ্যে আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছে! এই উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে কিছু প্রকাশক আমেরিকায় স্থিতু হয়েছে, বসতি গেড়েছে। তাদের নতুন এই জীবনের অবদানও বইমেলার প্রাপ্য।
৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলার সফলতা কামনা করি। বইমেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন জানাই।
লেখক : প্রকাশক, সময় প্রকাশন
ছবি থেকে আরো পড়ুন