https://www.prothomalony.com/
18037
north-america
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ ১২:১২
৯/১১ মামলা নতুন
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা ৯/১১ হামলার বিচার প্রক্রিয়া আবারও এক নতুন আইনি বাধার মুখে পড়ল। গুয়ানতানামো বে সামরিক আদালতের বিচারক, বিমানবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল শ্রামা, রায় দিয়েছেন যে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদ ২০০৭ সালে এফবিআইয়ের কাছে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, তা স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়নি।জ্ঞ ফলে বিচারে তা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু তাই নয়, ২০০৭ সালের পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদগুলোতে দেওয়া তাঁর বক্তব্যও একই কারণে বাতিল বলে ঘোষিত হয়েছে।
বিচারকের যুক্তি ছিল স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ — সিআইএ হেফাজতে যে মানসিক নিপীড়ন ও কঠোর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে মোহাম্মদকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এফবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদ ছিল সেই ধারাবাহিকতারই সম্প্রসারণ। বিচ্ছিন্ন কোনো অধ্যায় নয়। প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে এফবিআই এই ধারাবাহিকতা থেকে প্রকৃত অর্থে মুক্ত ছিল। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয়, তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাঁকে স্পষ্টভাবে জানাননি যে তাঁর নীরব থাকার অধিকার আছে। আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ আছে, কিংবা তাঁর বক্তব্য পরবর্তীতে বিচারে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
এই রায় এমন এক সময়ে এলো, যখন মাত্র কয়েকদিন আগেই বিচারক শ্রামা মোহাম্মদ ও তাঁর তিন সহ-আসামির বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করেছেন ২০২৮ সালের ৫ জুন। প্রসিকিউশন চেয়েছিল ২০২৭ সালের জানুয়ারিতেই বিচার শুরু হোক, কিন্তু বিচারক তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এই যুক্তিতে যে অমীমাংসিত প্রাক-বিচার প্রমাণ-সংক্রান্ত জটিলতা মেটাতে আরও সময়ের প্রয়োজন।
অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন খালিদ শেখ মোহাম্মদ ছাড়াও ওয়ালিদ মুহাম্মদ সালিহ মুবারক বিন আতাশ, মুস্তফা আহমেদ আদম আল হাওসাউই এবং আলি আবদুল আজিজ আলি — যাঁরা প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটানো সেই ভয়াবহ হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে সামরিক জুরি বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে। তারপর জুরি গঠনের ৩০ দিনের মধ্যে শুরু হবে প্রারম্ভিক বক্তব্য, এবং প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন শেষ হওয়ার ৬০ দিন পর আসামিপক্ষ তাদের মূল যুক্তি তুলে ধরবে।
এই মামলার ইতিহাস নিজেই একধরনের ক্লান্তিকর মহাকাব্য। প্রমাণ, গোপনীয় নথি, সিআইএ হেফাজতে আসামিদের সঙ্গে আচরণ, এবং জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত বক্তব্য বিচারে ব্যবহারযোগ্য কিনা — এসব প্রশ্নে বছরের পর বছর ধরে বিতর্ক চলছে। ২০০৩ সালে পাকিস্তানে ধরা পড়ার পর খালিদ মোহাম্মদ বছরের পর বছর সিআইএর হেফাজতে ছিলেন। ২০০৬ সালে তাঁকে গুয়ানতানামো বে-তে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর আইনজীবীরা বরাবরই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, সিআইএ হেফাজতে নির্যাতন, বিচ্ছিন্নতা ও একাকী কারাবাসই পরবর্তীতে এফবিআইয়ের কাছে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে। ২০১৪ সালে মার্কিন সিনেটের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, মোহাম্মদকে একশোরও বেশিবার ওয়াটারবোর্ডিং করা হয়েছিল।
গত শুক্রবারের এই রায় প্রসিকিউশনের হাত থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ কেড়ে নিলেও,শেখ মোহাম্মদ বা তাঁর সহ-আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার সমাপ্তি ঘটায়নি। অন্য দুই আসামি — ওয়ালিদ বিন আতাশ ও আল হাওসাউই — এর স্বীকারোক্তি নিয়ে এখনো কোনো রায় আসেনি। প্রধান প্রসিকিউটর রিয়ার অ্যাডমিরাল অ্যারন সি. রুগ জানিয়েছেন, আপিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁরা বিচারকের এই রায় খতিয়ে দেখবেন। বিচারক এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁদের পাঁচ দিন সময় দিয়েছেন, প্রয়োজনে আরও পাঁচ দিন বাড়ানোর সুযোগসহ।
প্রসিকিউশন এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিচার চাইছে, যদিও একসময় মামলাটি ভিন্ন পথে গড়িয়েছিল। ২০২৪ সালে শেখ মোহাম্মদ ও তাঁর দুই সহ-আসামি মৃত্যুদণ্ড এড়াতে দোষ স্বীকারের বিনিময়ে একটি সমঝোতা চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন সেই চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেন, এরপর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। গত বছর একটি মার্কিন আপিল আদালত নিম্ন আদালতের সেই সমঝোতা-সমর্থক রায় উল্টে দিয়ে মামলাকে আবার বিচারের পথে ঠেলে দেয়।
ইতিমধ্যে বছরের পর বছর ধরে বিলম্বিত এই মামলায় সাম্প্রতিক এই প্রমাণ-সংক্রান্ত রায় যোগ করল আরও একটি জটিল অধ্যায়। ২০২৮ সালের ৫ জুন জুরি বাছাই দিয়ে বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারিত হলেও, প্রসিকিউশন শেষ পর্যন্ত কোন প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারবে, তা নিয়ে আইনি লড়াই এখনো অব্যাহত থাকবে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন