https://www.prothomalony.com/
17777
north-america
জুলাই শহিদ স্মরণে
কোথাও ঝরে না বৃষ্টি
তমিজ উদ্দীন লোদী
জুলাই এসেছিল লাল চোখ মেলে। তার বুকে বৃষ্টি ছিল না,
ছিল আগুনের ফোঁটা—পুড়ে যাওয়া আকাশের ছাই ঝরে পড়ত
নিস্তব্ধ নগরীর গায়ে। সময় তখন পঙ্গু, হাতে-পায়ে বেঁধেছিল
আগুনের শিকল, শুধু একটানা চিৎকার—যা শোনা
যায় না, কিন্তু থেঁতলে যায় হাড়ে।
পথঘাট গিলেছে সূর্যোদয়ের আলো, প্রতিটি দেয়ালে
আঙুলের ছাপ
সবাই মিলে আঁকা এক গ্রাফিতি , দুহাত প্রসারিত বুক
চিতিয়ে দাঁড়ানো
এক যুবক, পানি হাতে দৌড়ানো এক তরুণের চোখের তৃপ্তি।
কোথাও ঝরে না বৃষ্টি। শুধু রক্তের নদী বয়ে চলে উল্টো দিকে।
জুলাই নামে এক স্মৃতি, যে স্মৃতি নিজেই জানে না সে কী—ব্যথা
নাকি শপথ? আলো ঝরে পড়ে ভাঙা কাঁচের মতো।
যেন অপেক্ষা করে কোনো প্রতিধ্বনির—অথচ প্রতিধ্বনি নেই
আছে শুধু শূন্যতার গোলাপ ।
জুলাইয়ের প্রতিটি দিনই এক বিস্ফোরণ, যার ভেতর
লুকিয়ে রয়েছে রক্তের
দগ্ধ গান। ধারালো এক দুপুর, যখন ঘড়ির কাটা দাঁড়িয়ে
যায় সময়ের মাঝামাঝি
ঠিক যেখানে জীবন আর মৃত্যু পরস্পরকে চুমু খায়।
রক্তাক্ত জুলাই—
যার গায়ে লেখা আছে অগণিত নাম— যারা হারায়,
অথচ থেকে যায় স্মৃতির
ফাঁকে ফাঁকে, চোখের পলকে, প্রতিটি অস্পষ্ট সকালের গভীরে, ইতিহাসে। তার রং
বিবর্ণ হয় না , বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে ঘনীভূত হয়—
ঠিক মাটির নিচে চাপা পড়া
বীজের মতো, যে বীজ জানে একদিন ফুটবে, অন্ধকারকে চিরে, আর লাল করে দেবে সমস্ত জুলাইকে।
রিয়ার রক্তে
কাজী জহিরুল ইসলাম
কী বিশাল এক ফড়িং উড়ছে ছাদে!
মেয়েটি দেখেনি হেলিকপ্টার আগে
যন্ত্রফড়িং উড়ছে নির্বিবাদে
ছুঁয়ে দিতে ওর ভীষণ ইচ্ছে জাগে।
জানালায় চোখ রাখে শিশু রিয়া গোপ,
আকাশের নীল হঠাৎ পাল্টে গেল।
কালো মেঘ নয় যেন রক্তের ছোপ
দাম্ভিক পাখি আনন্দে উদ্বেলও।
অগ্নি-পাখির মুখ থেকে ঝরে গুলি।
মেয়েটির চোখে অবাক কৌতুহল
বিস্ময় মাখা মিষ্টি আদুরে বুলি
মুহূর্তে সব শোকের অশ্রুজল।
পার হয়ে এই মৃত্যু-বর্বরতা
রিয়ার রক্তে লেখা হলো স্বাধীনতা।
আমি কি সত্যিই মানুষ?
সুমন শামসুদ্দিন
যখন তোমাদের নিস্পাপ দেহ
ময়লার বস্তার মতো ছুঁড়ে ফেলা হলো-
তখন আমার চোখে অন্ধপাথর!
যখন তোমার মাথায় বুলেটের নৃত্য,
ছিটকে বেড়িয়ে পড়ে অবাক-মগজ-
তখন আমার বুকে নিস্তব্ধ গুহার অন্ধকার!
যখন তোমার স্পন্দনরত হৃদপিণ্ড
কুপিয়ে ছিন্নভিন্ন করা হলো-
তখন আমার রক্ত অসভ্যতার শিখরে পৌঁছলো!
যখন চৈতন্য পুরোপুরি লোপ পেল,
তারা নিজেদের কাঁচা মাংসের কাবাব খেলো-
পশুরা তখন লজ্জা পেয়ে আত্মহত্যা করলো!
আমি কি সত্যিই মানুষ ছিলাম?
প্রজন্মের জাগরণ শুনি
শেলী জামান খান
তোমরা আমাকে ডায়াসপোরা বলো,
আমি মেনে নিয়েছি!
তোমরা আমাকে প্রবাসী বলো,
আমি মেনে নিয়েছি।
তোমরা আমাকে যাযাবর বলো,
আমি প্রতিবাদ করিনি।
এই পরদেশে আমি তো সুখেই ছিলাম।
আমার বুকের ওপর কেউ কখনো বন্দুক তাক করেনি!
কেউ আমার কণ্ঠরোধ করেনি!
তবুও চব্বিশের জুলাই আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
আজকাল আমি ঘুমাতে পারি না।
আমার বুকের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা 'একাত্তর' জেগে উঠেছে।
আমি হন্যে হয়ে ফেসবুক,
ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব স্ক্রল করি!
উদ্ব্রান্তের মতো টেলিভিশনের পর্দায় তাকিয়ে থাকি!
আমার সন্তানের রক্তে জন্মভূমির মানচিত্র ভিজে গেছে!
একাত্তরে আমাদের দরজায় দরজায়
কড়া নেড়েছিল—
'মুক্তি হ্যায় কেয়া ঘর মে?'
শুনছি ঢাকার রাজপথে এখন সেই খাকি প্যান্টের টহল,
জলপাই রঙের ট্যাঙ্কের বহর!
গভীর রাতে দরজায় খটখট—
'ঘরে ছাত্র কে আছে? ছাত্র আছে ঘরে?'
জুলাই আন্দোলনে উত্তাল দেশ,
রক্তে রঞ্জিত পথ, নির্ঘুম শহর!
চোখ বুজলেই দেখতে পাই সাইদ, মুগ্ধ, শান্ত আর
সৌহার্দ্যের মুখ!
ওরা সংখ্যায় অগণতি—
কজনের নাম লিখব আমার কবিতায়?
তরুণ বয়সে আমার বুকেও এমনি প্লাবন এসেছিল।
তাই তো আমার উষ্ণ রক্তে
আমি প্রজন্মের জাগরণ শুনি।
যুগে যুগে, কালে কালে বেপরোয়া সাহসীরাই প্রথা ভাঙে।
ফাইয়াজ, দীপ্ত, রুদ্র এবং ইয়ামীনরাই চিরকাল পথে নামে।
অনেকেই বলেন, 'জেন-জি'রা গেছে বখে,
তাদের সময় কাটে ড্রাগস, পর্ন, ইন্টারনেট ঘেঁটে।
ওরা কুচক্রী নয়, ওরা সোজা-সাপ্টা, স্বাধীনচেতা,
উল্টোপাল্টা, প্যাঁচঘোচে ওদের দারুণ অনিহা!
ওদের কথা একটাই— দেশ গড়,
না পারলে পদ ছাড়!
বেবি বুমার্স, বেবি বাস্ট, জেন এক্স আর মিলেনিয়ামরা
সব ঘন হয়ে আসো,
এসো, চোখ খুলে, হৃদয় খুলে দাঁড়াই ওদের পাশে!
জেন-আলফার জন্য একটি শক্ত জমিন তৈরি করো—
ওরা বাঁচুক একটি বাকস্বাধীনতার দেশে!
এই কষ্ট রাখবো কোথায়?
লুবনা কাইজার
হঠাৎ ফুলের সুবাসটুকু পৃথিবী থেকে স্বর্গে
মিলিয়ে গেল,
আকাশে-বাতাসে সেদিন তীব্র আর্তনাদ ছিল।
অবেলায় ঝরে গেল স্নিগ্ধ কতগুলো ফুল,
কেন ওরা করে পাপে ভরা এমন ঘৃণিত ভুল?
নরপিশাচ ওরা, নর্দমার নোংরা কীট!
তীব্র এক কষ্ট বেঁধেছে বুকে গিট।
জানি না এর শেষ কোথায়?
মনটা ভরে আছে ব্যথায়, ব্যথায়।
আহারে! আহারে! আহারে!
হয়তো চিনি না, কিন্তু সবাই চিনেছি তাহারে।
তোমরা ছেলে-মেয়ে কোন মায়েরই,
পৃথিবীর বুকে সুন্দর ভবিষ্যৎ ছিল তোমারই।
যেখানেই থাকো, নিষ্পাপ তোমরা ফুলগুলো,
ক্ষমা নেই ওদের, শত অপরাধ আর ভুলগুলো।
পৃথিবীকে জানাও, ধিক্কার দাও তাদের,
যেখানে দুর্গন্ধে ভরা জঘন্য অপরাধ যাদের।
ধিক্কার দাও তাদের, যেখানে বিবেক মৃত—
অপরাধীদের কবলে,
পৃথিবী আজ নোংরা, বিষধর সাপের ছোবলে।
যন্ত্রের পেটে বসন্ত
এইচ বি রিতা
শুনতে পাই-অসুর-দাঁতের ক্রুর ঘর্ষণে পিষ্ট স্বপ্নের
বিপন্ন আর্তনাদ;
কর্পোরেট জঠরে যেখানে মেধার নিরন্তর অপচয়,
শুকিয়ে কঙ্কাল হয় আমাদের ক্লান্ত বংশলতিকা।
এখানে অনাহার নেই, আছে এক নিদারুণ আত্মহনন—
রক্ত দিয়ে লিখে যাওয়া কবরের শিলালিপি,
অন্ধকার খনি থেকে উঠে আসা এক একটি নিস্প্রভ দিন।
অথচ তোমাদের প্রাসাদে, ঐ উদ্ধত কার্নিশে
এখনও জমে আছে ঘনীভূত মেদ;
শোষিত শ্রমের সেই রক্তমাখা ডলারের স্থবির উল্লাস।
টাকা! টাকা!
রক্তাক্ত ডলার আর গদি-বিলাসের মদিরায় মত্ত তোমরা—
মুছে দিতে চাও আমাদের ভ্রাতৃ-শোণিতে মুদ্রিত
সেই অমর 'জুলাই সনদ'
আমরা বিকিয়েছি আত্মা—কেউ স্বার্থের লোলুপতায়,
কেউ বা ভীরু নিঃসঙ্গতায়,
কিংবা নাগরিক উদাসীনতার এক ধূসর কুয়াশায়।
অথচ রাজপথের সেই তপ্ত রক্ত আজও শুকায়নি;
যার স্পন্দনের ওপর দাঁড়িয়ে তোমরা আজ আঁকো—
বিপ্লবের ইশতেহার পুড়িয়ে ফেলার নীল নকশা, এক
নিপুণ শঠতা।
রেডিওর কর্কশ কণ্ঠে আজ আর বাজে না বিদ্রোহের
ললিত রাগিণী,
সেখানে কেবল পচা ব্যবস্থার কর্কশ সাইরেন আর
ষড়যন্ত্রের চোরাবালি।
ওহে ক্ষমতার শুভ্র অট্টালিকা...
তোমার ভিত্তি কি কম্পমান নয়?
তোমাদের নিয়ন্ত্রিত শৈত্যে কি পৌঁছায় না সেইসব
জননীর দীর্ঘশ্বাস—
যাদের সন্তানরা ফেরেনি ঘরমুখো মেঘেদের মতো,
কিন্তু রেখে গেছে এক নতুন মানচিত্রের অমোঘ শপথ!
টিনার স্বপ্ন
দিনা ফেরদৌস
গত কয়েক মাস ধরে টিনার জীবনে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। ঘুম গাঢ় হলেই এক ভিন্ন দুনিয়া চোখের সামনে খুলে যায়। রূপকথার গল্পের মতো হলেও একেবারে নিখুঁত এক সংসার—সেখানে ছিল দীপন। ছোট্ট, গোছানো তিন রুমের ফ্ল্যাট; বারান্দায় ঝুলন্ত নানা রঙের পেটুনিয়া ফুলের গাছ; বিকেলে অফিস থেকে দীপনের ফেরা; বারান্দায় বসে চা খাওয়া।প্রতি রাত যেন আগের রাতের সিক্যুয়েল—আজ রান্নার ঝামেলা, তো কাল বাজারের ঝামেলা, পরশু ছুটির দিনে দুজনে মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া। টিনা সেই জগৎটাকে এমনভাবে ভালোবেসে ফেলেছিল যে, বাস্তবের দিনগুলোকে মনে হতো এক দীর্ঘ, অর্থহীন প্রতীক্ষা।
বিছানায় বসে আনমনে আঙুল দিয়ে চাদরের নকশা ঘষছিল টিনা। মা পাশের ঘর থেকে উচ্চস্বরে ডেকে বললেন, "টিনা, তোর বাবা পাত্রপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন। আগামী শুক্রবার মুরুব্বিরা আসবেন পাকা কথা বলতে। তাহের ছেলেটাকে তো দেখেছিস! ছেলেটা যেমন ভালো, ওদের পরিবারটাও আমাদের সাথে যায়। অত উচ্চ আয়ের পেশাদার সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট হয়েও কোনো অহংকার নেই।"
মায়ের কথাগুলো টিনার কানে ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে ছিল দীপনের সংসারের ঠিকানায়। যে ঠিকানার কোনো মানচিত্র নেই, আছে কেবল স্বপ্ন আর টান।
গত এক সপ্তাহ ধরে সেই স্বপ্নের চাকা থেমে গেছে। যেদিন থেকে বাসায় বিয়ের কথা পাকা হলো, সেই রাত থেকে চোখ বন্ধ করলেই কেবল গাঢ় অন্ধকার। দীপনের কোনো খোঁজ নেই। সেই নিখোঁজ সংসারের শোকে টিনার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। এই কটা রাত ধরে ভালোভাবে ঘুমাতেও পারছে না টিনা।
শুক্রবার বিকেলে টিনাদের ড্রয়িংরুমে বেশ একটা উত্তেজনা। এবারও টিনাদের বাসায় তাহের এসেছে সবার সাথে। টিনা চায়ের ট্রে হাতে ঢুকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবার সাথে চোখ মিলিয়ে কথা বলল, হাসিমুখে চা এগিয়ে দিল। যতবারই তাহেরের সাথে টিনার দেখা হয়েছে, তাহেরের মধ্যে দীপনকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছে টিনা। স্বপ্নের দীপনের সাথে তাহেরের চেহারার আদৌ কোনো মিল নেই। গায়ের রং, গলার স্বর, কথা বলার স্টাইল, এমনকি হাসির ধরনটাও সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অমিলটুকুই যেন টিনাকে আরও বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল। সে বুঝল, বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
সম্পূর্ণ নতুন, অচেনা এক অধ্যায়ের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে যাচ্ছে টিনা।
পরের দিনগুলোতে তাহেরের সাথে বেশ কয়েকবার দেখা হলো, ফোনে কথা হলো টিনার। তাহের মানুষ হিসেবে সরল মনের হলেও বেশ রসিক। এই কদিনে তাহেরকে বেশ আপন মনে হলো টিনার। তাহেরের সহজ-সরল ভাষা টিনাকে মুগ্ধ করেছে। টুকটাক গল্পের ফাঁকে ভবিষ্যতের টুকরো পরিকল্পনাও সেরে ফেলেছে দুজন।
স্বপ্নের স্মৃতিগুলো তাকে তাড়া করে ফিরলেও, সে কথা কাউকে বলার উপায় নেই। বলার কোনো মানেও নেই। টিনা ভেতরে ভেতরে দীপনকে মিস করলেও চেষ্টা করল বাইরে যেন কিছু প্রকাশ না পায়। বড়রা জানতে পারলে নির্ঘাত পাগল ভাববে, আর ছোটরা জানলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।
ঘন গাঢ় নীল জামদানি পরে বিয়ের আসরে বসেছিল টিনা। স্বাভাবিকভাবেই সবার সাথে কথা বলল, বন্ধুদের সাথে ছবি তুলল, তাহেরের দিকে তাকিয়ে হাসলও কয়েকবার। মালাবদলের সময় দুজন দুজনের চোখে চোখ রেখেছিল মিষ্টি হেসে; দুজনে দুজনকে কেক খাইয়ে দিল।
রাত নামল। বাসরঘরে বসে থাকতে থাকতে টিনা ভাবল, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। যদিও তার মনের গভীরে তখনো দীপনের জন্য ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। টিনা ঠিক করল, ধীরে ধীরে মনের ফাঁকা জায়গাটা ভরিয়ে নেবে তাহেরকে দিয়ে। এটাই তো বাস্তবতা!
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল তাহের। টিনা মুখ তুলে তাকাল—আজ সারাদিন যেভাবে বহুবার তাকিয়েছে, ঠিক সেভাবেই।
কিন্তু একি! এই মুখ তো তাহেরের নয়!
ডান চোখের কোণে ছোট্ট তিল, সেই চাহনি—যা কয়েক মাস ধরে তাকে ঘুম পাড়িয়েছে। সেই চেনা মুখ, যাকে এতগুলো রাত ধরে ভালোবেসেছে অন্য এক জগতে!
উঠে দাঁড়াল টিনা, পিছিয়ে গেল দুই পা।
ভয়ে কাঁপানো গলায় বলল, "তুমি... তুমি এখানে কী করে?"
দীপন বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা হেসে বলল, "কী হয়েছে? এমন করে তাকিয়ে আছ কেন?" একটু দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে আবার বলল, "এখানে বুঝি আর কারও থাকার কথা?"
টিনার ভেতরের অনুভূতিগুলো যেন বিদ্রোহী হয়ে উঠতে শুরু করেছে। কোনো উত্তর না দিয়ে সে সোজা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
ড্রয়িংরুমে শাশুড়ি কয়েকজন আত্মীয়কে বিদায় দিচ্ছিলেন। টিনাকে একা বেরিয়ে আসতে দেখে আন্তরিকভাবে হেসে বললেন, "কী রে মা, তুই এখানে? দীপন কোথায়?"
টিনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। অনেক কষ্টে শুধু বলল, "দীপন... দীপন আপনার কে হয় মা?"
শাশুড়ির হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি অবাক হয়ে বললেন, "কী বলে রে মেয়েটা! শরীর খারাপ লাগছে নাকি রে মা?"
আশপাশের সবাই বিস্মিত চোখে টিনার দিকে তাকিয়ে আছে—যেন প্রশ্নটাই তাদের কাছে অর্থহীন!
টিনা চারদিকে তাকাল। ড্রয়িংরুমে সাজানো বিয়ের উপহারের বাক্স, ফুলের মালা, অতিথিদের ফেলে যাওয়া চায়ের কাপ—সবই ঠিকঠাক। দেওয়ালের ওপরে বহুদিন আগের পারিবারিক ছবিগুলো আগের মতোই ঝুলছে। কোথাও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, যা তার মনে জেগে ওঠা সন্দেহকে সত্যি বা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে।
ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক শীতলতা নেমে এল।
মনে হলো, ভুলটা হয়তো কোনো মানুষের নয়...
ভুলটা যেন বাস্তবতার!
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীপনের দিকে চোখ পড়ল টিনার। দীপন সেই পরিচিত মৃদু হাসি মুখে নিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিল—ঠিক যেমনটা সে বহুবার স্বপ্নে দেখেছে। টিনাও তার হাতটা বাড়িয়ে দিল। দীপন টিনার হাত ধরে নিয়ে গেল বারান্দায়। বারান্দায় ঝুলে আছে নানা রঙের পেটুনিয়া ফুল।
টিনার মনে হলো, সে ঘুমে স্বপ্ন দেখছে; বেশি ভাবতে গেলেই হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে। আবার মনে হলো—এ কী করে সম্ভব! প্রশ্নগুলো মনের ভেতরে তখনও অমীমাংসিত।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন