https://www.prothomalony.com/

17766

new-york

নিউইয়র্ক

নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হলো চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ ২৩:৪৭

নিউইয়র্কের অদূরে মনোরম চেস্টনাট রিজের থ্রিফোল্ড এডুকেশনাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো দুই দিনব্যাপী চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এ আয়োজন করে বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি সোসাইটি (BILS)। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি অটিজম স্পেকট্রামে থাকা তরুণ-তরুণীদের সৃজনশীল বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

সবুজে ঘেরা রিসোর্ট-সদৃশ পরিবেশে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন অ্যান্ড্রু সেঞ্চেজ, সামিনা খন্দকার ও প্রথম চক্রবর্তী। তাঁদের সম্মিলিত কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। কনভেনর গিয়ানা মেলার স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় মূল আয়োজন।

এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে শাড়ি’। সেই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয় পুরো অনুষ্ঠানমালা। উদ্বোধন করেন এমেরিটাস অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য ও লেখক ড. মোস্তফা সারওয়ার।

প্রখ্যাত কবি সুবোধ সরকার বলেন, “শাড়ি শুধু একটি পরিধেয় বস্ত্র নয়; এটি হাজার বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং সর্বোপরি নারীর আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের এক অনন্য বাহন।” পরে তাঁর বিখ্যাত ‘শাড়ি’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন শিল্পী পারভীন সুলতানা।

সম্মেলনের সভাপতি, জাতিসত্তার কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা শাড়ির বৌদ্ধিক সম্পদ (Intellectual Property) এবং এর বৈশ্বিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

এবারের আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, ভারত, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, গায়ানা, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, শিল্পী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীরা অংশ নেন। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন যেন শান্তিনিকেতনের এক আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সম্মেলনে রূপ নেয়। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বন্ধনে পৃথিবী যেন একসূত্রে গাঁথা হয়েছে—এমন অনুভূতি প্রকাশ করেন অনেক অংশগ্রহণকারী।

BILS-এর পৃষ্ঠপোষক ও আয়োজক ড. ধনঞ্জয় সাহা বলেন, সাহিত্যচর্চার জন্য যেমন দরকার সৃজনশীল পরিবেশ, তেমনি সৃজনশীল মন গড়ে তুলতে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। এ বিষয়ে বক্তব্য দেন ডা. দীপা সাহা ও ম্যারাথন রানার নাসির শিকদার। তাঁরা তেলবিহীন রান্না, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং দৌড়ানোর উপকারিতা তুলে ধরেন। ডা. দীপা সাহা সুস্থ জীবনযাপন ও ইতিবাচক চিন্তার সঙ্গে সৃজনশীল লেখালেখির নিবিড় সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি, স্প্যানিশ ও তুর্কি ভাষায় মৌলিক কবিতা, গল্প ও ছড়া পাঠ করা হয়। ড. ধনঞ্জয় সাহা তাঁর উদ্ভাবিত নতুন সাহিত্যধারা ‘ছড়াবিতা’—ছড়া ও কবিতার সমন্বিত রূপ—সম্পর্কে আলোচনা করেন। তাঁর একটি ‘ছড়াবিতা’ পাঠ করেন ইসরাত বুখারি।

মেলায় ছিল তাজা ফল, স্বাস্থ্যকর অর্গানিক খাবার, শিল্পকর্ম প্রদর্শনী এবং লেখকদের বই প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অটিজম স্পেকট্রামে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন লেখকদের পরিবেশনা এবং Endeavor21+ Autism Program-এর অংশগ্রহণকারীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। এনজা ও পিয়েরা লোম্বার্দোর শিল্পকর্ম দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। এ পর্বে জন কার্লোস উডি গাথরির বিখ্যাত গান ‘This Land Is Your Land’ পরিবেশন করে উপস্থিত সবার প্রশংসা অর্জন করেন।

এছাড়া অনুষ্ঠিত হয় লাইভ ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রতিযোগিতা, যেখানে অংশ নেন অনেক সম্ভাবনাময় লেখক। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন ডা. কৌশিক কর।

আবৃত্তি পরিবেশন করেন টিটানিয়া গুপ্তা, দ্বীপ নারায়ণ গুপ্তা, খালেদ মিঠু, নিলুফার জারিন, পারভীন সুলতানা, সংঘমিত্রা ব্যানার্জি, অশ্বিনী প্রসাদ এবং ভারতের প্রখ্যাত সারেঙ্গি শিল্পী উস্তাদ কামাল সাবরি। গদ্য-কবিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিদের অভিবাসনের ইতিহাস তুলে ধরে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেন ড. অশ্বিনী প্রসাদ।বাংলা আবৃত্তিতে প্রথম পুরষ্কার পান কিশোরী আদ্রিকা দাস।

গল্প ও কবিতা পাঠ করেন ডা. তপতী রায়, বেনজির সিকদার, মোহাম্মদ কাইউম, রফিকুল ইসলাম, শাহ জে. চৌধুরী, বনানী সিনহা, খালেদ সরফুদ্দীন, আইজ্যাক স্টেইনবার্গ, কমোলিকা পান্ডে, ইফফাত আরা, ড. মোহাম্মদ মাসুম, ড. মল্লিকা ধরসহ আরও অনেকে। একক কবিতা পাঠ করেন ফারহানা ইলিয়াস তুলি, রকল্যান্ড পোয়েটস গ্রুপের শেরিল লার্নার এবং তুরস্কের কবি মুরাত নিমিত। স্প্যানিশ ও ইংরেজিতে গল্প পাঠ করেন আইরিস তেহেদাস ও লুজ কুয়েভাস। ভ্রমণকাহিনি পাঠ করেন সুলতানা ইসমত আরা।

ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লিপিলেখা-এর সদস্যরা, বিশেষ করে সভাপতি টিটানিয়া গুপ্তা, অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। লেখক ও কমিউনিটি লিডার ড. দিলীপ নাথ গত বছরের রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলার সাফল্য এবং এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সেমিনারে বাংলা ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের পারস্পরিক প্রভাব এবং উৎকর্ষ নিয়ে আলোচনা হয়। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন কবি ফকির ইলিয়াস।

সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলা ও পাশ্চাত্য সংগীত পরিবেশন করেন অ্যান্ড্রু সেঞ্চেজ, অরচিত কৃষ্ণান, উস্তাদ কামাল সাবরি, সামিনা খন্দকার, ডা. শিউলী রায়, ডা. মো. জুলফিকার হোসেন, গৌতম সাহা এবং ডা. অর্পিতা ঘোষ।

অনুষ্ঠানে স্বল্প সময়ের জন্য উপস্থিত ছিলেন কবি ও প্রকাশক হুমায়ুন কবির ঢালি এবং বরেণ্য সংগীতশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়। তাঁদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।

রিট্রিটের অংশ হিসেবে ছিল ফরেস্ট হাইকিং, যোগব্যায়াম, সাঁতার, ক্যাম্পিং, ফার্ম ট্যুর এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে অবকাশযাপনের বিশেষ আয়োজন।

দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ড. মোহাম্মদ মাসুম। তিনি তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরে ডা. অনিমিতা সাহা ‘অন্ধকার থেকে আলোয়’ শিরোনামে নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।

নিউইয়র্কে পরিকল্পিত শাড়ি জাদুঘরের সহপ্রতিষ্ঠাতা ড. অশ্বিনী প্রসাদ শাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে পুরোনো শাড়ি দানের আহ্বান জানান। আয়ারল্যান্ডের ব্যারিস্টার ক্যারেন মরিস শাড়িকে ঘিরে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই বিষয়ে বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষক ক্রিস্টিন ম্যাকক্লিন।

সমাপনী পর্বে বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করা হয়। পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এবং সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য BILS Award 2026 প্রদান করা হয় ড. মোস্তফা সারওয়ারকে। ডা. অবনীভূষণ চৌধুরী আবৃত্তি পুরস্কার লাভ করেন অশ্বিনী প্রসাদ এবং বীণাপাণি সাহা সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন বেনজির সিকদার।

এ বছর প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করা হয় BILS Writers-in-Residence Award। এ সম্মাননা লাভ করেন ভারতের কবি সুবোধ সরকার এবং বাংলাদেশের কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা। এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত লেখকেরা দুই দিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত BILS-এর পৃষ্ঠপোষকতায় অবস্থান করে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার সুযোগ পাবেন।

সমাপনী বক্তব্য দেন সম্মেলনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল হুদা এবং কনভেনর গিয়ানা মেলা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন BILS-এর প্রেসিডেন্ট ড. ধনঞ্জয় সাহা।

অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে পরিবেশ সচেতনতার প্রতীক হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুদিনার চারা বিতরণ করা হয়।

পরে ঘোষণা করা হয়, আগামী রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২৪–২৫ জুলাই ২০২৭। আগামী আসরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মেঘনা থেকে মিসিসিপি’। প্রাথমিকভাবে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণে সম্মতি জানিয়েছেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণার জন্য সুপরিচিত চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও গবেষক ড. ব্লাঙ্কা নটকোভা (Blanka Notková)।
 

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন