https://www.prothomalony.com/

6312

bangladesh

বাংলাদেশ

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত কমছে

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:০৯

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগতই কমছে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আছে ২ হাজার ৩০৬ কোটি ডলার (২৩.০৬ বিলিয়ন)। ৩০ আগস্ট বুধবারের তথ্য এটি। এরমধ্যে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) দায় পরিশোধ করা হলে রিজার্ভ কমে ২ হাজার ২০০ কোটি ডলারের (২২ বিলিয়ন) নিচে নেমে যাওয়ার কথা।

জুলাই-আগস্ট সময়ের জন্য সুদসহ ১১০-১২০ কোটি ডলার আমদানি দায় পরিশোধ করতে হবে। দুই বছর আগে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভ ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮.০৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর থেকে ধারাবাহিক কমছে রিজার্ভ, যা এখন পর্যন্ত কোনো ভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী, রিজার্ভের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের উপরে থাকতে হবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম আরও বেড়েছে, যা রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে আমদানিতে ডলার কিনতে হবে আগের চেয়ে আরও ৫০ পয়সা বেশি দামে। কারণ অনেক ব্যাংকসীমার চেয়ে বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। এতে আমদানি খরচ বাড়বে। এর প্রভাবে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলার সংকটের পাশাপাশি নগদ ডলারের দামও বেড়েছে। এখন এক ডলার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ১১৭ থেকে ১১৮ টাকা। দাম বাড়ায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বাংলাদেশ ব্যাংক। বেশি দামে ডলার বিক্রির অপরাধে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত ও সিলগালা করা হয়। ফলে মানি চেঞ্জারগুলোয় ডলার কেনাবেচা প্রায় বন্ধ।

অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, যেভাবে প্রতি মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমছে, তাতে বড় ধরনের সংকটের দিকে এগোচ্ছে দেশের অর্থনীতি। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ এসোসিয়েশন (বাফেদা) ও এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) বৈঠকে ডলারের দাম আরও এক দফা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের আলোকে রোববার থেকে রপ্তানিকারকরা প্রতি ডলারে সর্বোচ্চ ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। আগে পেতেন ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা। রপ্তানিকারকরা বাড়তি পাবেন ১ টাকা। প্রবাসীরা রেমিট্যান্সে পাবেন সর্বোচ্চ ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা। আগে পেতেন ১০৯ টাকা। তারা প্রতি ডলারে ৫০ পয়সা বেশি পাবেন। বেশি দামে ডলার কেনার কারণে ব্যাংকগুলোও বেশি দামে বিক্রি করবে।

ডলারের দাম নতুন করে বাড়ানোর ফলে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। কারণ বাড়তি দামে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করতে হবে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। এর সঙ্গে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। আর টাকার মান কমার কারণে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাবে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৬৯ শতাংশ।

এদিকে আমদানির পরিমাণ কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে আমদানি খরচও বেড়ে যাবে। এতে ডলারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। কমে যাবে রিজার্ভ। তখন ডলারের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক ও মানি চেঞ্জারগুলোয় ডলার মিলছে না। ফলে নগদ ডলারের দাম আবারো বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহ থেকে রাজধানীর খোলাবাজারে ডলারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। খোলাবাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৭-১১৮ টাকার মধ্যে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী, এখন নগদে প্রতি ডলারের দাম ১১২ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে থাকার কথা। এদিকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করায় ৭ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি একই কারণে আরও ১০ প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেছেন, ডলার কেনাবেচা হচ্ছে। তবে সবাই যে বিক্রি করবে- এমন নাও হতে পারে। কারণ অনেকের কাছে ডলার নাও থাকতে পারে। যাদের কাছে ডলার আছে তারা কেনাবেচা করছে। যার কাছে নেই সে কেনাবেচা করবে না- এটাই স্বাভাবিক।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকে দেশে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। রিজার্ভও কমতে থাকে। রিজার্ভের এই পতন ঠেকানোর জন্য নানারকম উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবে খুব বেশি কাজে আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপে এর মধ্যেই রিজার্ভ কমার হার কমে এসেছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে।

সেন্টার ফর পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, পুরো পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। শ্রীলঙ্কা থেকে আমরা দেড়শ’ মিলিয়ন ডলার পেয়েছি, সেটা যোগ হয়েছে। সেই সঙ্গে ইডিএফের (রপ্তানি উন্নয়নের তহবিল) থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে। এসব যোগ হওয়ার পর রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু রিজার্ভ কমেছে। তার মানে হচ্ছে, রিজার্ভ কিন্তু অনেক বেশি পরিমাণে কমছে। এখনো অনেক রেফার্ড পেমেন্ট (যেসব পেমেন্ট পিছিয়ে দেয়া হয়েছে) আছে। এই অবস্থা আরও খারাপ হতে যাচ্ছে বলে আমার ধারণা করছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, আমাদের হাতে এখন যে রিজার্ভ আছে, সেটা দিয়ে সাড়ে চার মাসের বেশি সময় চলবে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান মাধ্যম রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স। কিন্তু গত দুই বছর ধরে এই দুই খাতেই আয় কমেছে। আমদানির ওপর কড়াকড়ি করার পরেও এখনো রপ্তানির তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি। সাধারণত এখানে আবার নতুন ঋণ এসে থাকে, কিন্তু এই বছরে তেমনটা আসছে না।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন