https://www.prothomalony.com/
18433
religion
খতীব, নূরে মদীনা জামে মসজিদ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৫৬
সিজদা এক অনন্য ও অদ্বিতীয় সম্মাননা, যা একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহকে সিজদা করো (সূরা ফুসসিলাত: ৩৭)। সিজদার মাধ্যমেই মানবজাতির পিতা আদম আলাইহিস সালামকে প্রথম অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল, আর এর দ্বারাই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই নিবন্ধে সিজদার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
আল্লাহ তায়ালা আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদের তাঁকে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন (সূরা হা-মীম সিজদাহ: ১১)। ইবলিস ব্যতীত সকল ফেরেশতাই তাঁকে সিজদা করেছিল; ইবলিস অহংকারবশত এই আদেশ অমান্য করে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলে সে যুক্তি দেখায় যে, আদম মাটির তৈরি আর সে আগুনের তৈরি, তাই মাটির তৈরি মানুষকে সে সিজদা করতে পারে না এভাবে সে অহংকার প্রদর্শন করে। ফলে আল্লাহ তার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে চিরতরে অভিশপ্ত ঘোষণা করেন।
মূলত আল্লাহ তায়ালা তাঁর ইবাদতের জন্যই মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। মানব জাতির প্রতি অসামান্য ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেই সিজদার মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্মান দিয়ে আদম আলাইহিস সালামকে বন্ধুরূপে বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর ইবলিসের শয়তানি চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে আদম আলাইহিস সালামকে সতর্ক করে তাঁকে তার থেকে দূরে থাকতে বলা হয় এবং জান্নাতের একটি নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু শয়তান মিথ্যা ও লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামকে সেই নিষিদ্ধ ফল খাওয়াতে সক্ষম হয়। এরপর আল্লাহ তাঁদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে কিছুকালের জন্য পৃথিবীতে নির্বাসন দেন এবং শয়তানকেও অভিশপ্তরূপে পৃথিবীতে প্রেরণ করেন।
মূলত সিজদা কখনোই আদম আলাইহিস সালামের জন্য ইবাদত ছিল না, বরং তা ছিল মানব জাতির প্রতি অন্যদের সম্মান প্রদর্শনের একটি মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষে সিজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য এবং তাঁর প্রতি যাবতীয় ইবাদতের শ্রেষ্ঠাংশ। আল্লাহ মানবজাতির জন্য সালাতের মতো একটি ইবাদতের বিধান দিয়েছেন এবং সমগ্র বিশ্বের মানুষের সিজদার দিকনির্দেশনা হিসেবে বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফকে নির্ধারণ করেছেন। উল্লেখ্য, ইবলিস জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হলেও আল্লাহ তাকে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ও বিভ্রান্ত করার সীমিত ক্ষমতা দিয়েছেন, যা মূলত মানুষকে পরীক্ষা করার জন্যই। যে ব্যক্তি শয়তানের প্রবঞ্চনাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে, সে তার শ্রেষ্ঠত্ব বহাল রেখে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হয়ে জান্নাত লাভ করবে; আর যে শয়তানের পথ অনুসরণ করবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।
পৃথিবী মানুষের জন্য একটি সাময়িক পরীক্ষাকেন্দ্র মাত্র। জান্নাত থেকে নেমে আসা মানুষ পৃথিবীর এই পরীক্ষাস্থলে সৎ কাজের মাধ্যমে পুনরায় জান্নাতে ফিরে যেতে পারবে, অন্যথায় ব্যর্থ হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এই শিক্ষা দেওয়ার জন্যই আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির কল্যাণে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছেন এবং সিজদার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করেছেন।
সমগ্র সৃষ্টিজগৎই আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত। আল্লাহ বলেন, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, তারা ও তাদের ছায়াসমূহ সকাল-সন্ধ্যা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহকেই সিজদা করে (সূরা রা'দ: ১৫)। অন্যত্র বলা হয়েছে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু ও বহু মানুষ আল্লাহকে সিজদা করে, আর বহু মানুষ যারা সিজদা করতে অস্বীকার করে তাদের উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে গেছে, বস্তুত আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন তাকে সম্মান দেওয়ার কেউ নেই (সূরা হজ্জ: ১৮)। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, তারা কি আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুসমূহের প্রতি লক্ষ্য করে না, যাদের ছায়া ডানে-বামে ঢলে পড়ে বিনীতভাবে আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয়; আসমান ও যমীনের সকল প্রাণী এবং ফেরেশতাগণ আল্লাহকে সিজদা করে এবং তারা অহংকার করে না, বরং তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং যা আদিষ্ট হয় তাই পালন করে (সূরা নাহল: ৪৮-৪৯)।
যারা বিনয় ও আনুগত্যের সাথে আল্লাহকে সিজদা করে তারা বিশেষভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করে। আল্লাহ বলেন, কেবল তারাই আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে, যাদের তা স্মরণ করিয়ে দিলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং প্রতিপালকের পবিত্র মহিমা কীর্তন করে, তারা অহংকার করে না (সূরা সাজদা: ১৫)। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সিজদায় বা দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং প্রতিপালকের রহমতের আশা রাখে, সে কি তার সমান যে এমন করে না (সূরা যুমার: ৯)। এমনকি জড় বস্তুও আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত— আল্লাহ বলেন, তারকা ও বৃক্ষলতা সিজদারত আছে (সূরা আর-রহমান: ৬)।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মানুষের মধ্যে অনেকে আল্লাহকে সিজদা করে, আবার অনেকে করে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, এক দলকে আল্লাহ হেদায়েত দান করেছেন, আর আরেক দলের উপর ভ্রষ্টতা নির্ধারিত হয়ে গেছে, কারণ তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে অথচ মনে করে তারা সুপথপ্রাপ্ত (সূরা আ'রাফ: ৩০)। এই পৃথিবী মানুষের জন্য এক কঠিন পরীক্ষাকেন্দ্র। আল্লাহ বলেন, তিনিই মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, তোমাদের মধ্যে কে উত্তম কর্মশীল, তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল (সূরা মুলক: ১-২)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ কি মনে করে যে শুধু ঈমান আনার দাবি করলেই তাদের পরীক্ষা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে? আল্লাহ পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছিলেন, যাতে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী চিহ্নিত হয় (সূরা আনকাবুত: ২-৪)।
মানুষ ও জিন ব্যতীত অন্য কোনো সৃষ্টির হিসাব বা পরীক্ষা হবে না, কারণ তাদের মানুষের মতো জ্ঞান-বুদ্ধি বা শত্রু নেই। যারা জ্ঞান দ্বারা শয়তানের মোকাবিলা করে আল্লাহর নিদর্শন থেকে হেদায়েত লাভ করে, তারা পরকালেও আল্লাহর সিজদার মাধ্যমে সফলকাম হয়ে পরম সুখে অনন্তকালের জান্নাতে বসবাস করবে। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তাদের কী হলো যে তারা বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং কুরআন পাঠ করা হলেও সিজদা করে না (সূরা ইনশিকাক: ২০-২১)। অন্যত্র বলা হয়েছে, তাদের রহমানকে সিজদা করতে বললে তারা প্রশ্ন করে রহমান আবার কে, আর তাতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায় (সূরা ফুরকান: ৬০)।
এই অস্বীকারকারীরা পরকালেও সিজদা করতে সক্ষম হবে না এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। আল্লাহ বলেন, যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে এবং তাদের সিজদার আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা তা করতে সক্ষম হবে না; তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে ও তারা লাঞ্ছনাগ্রস্ত হবে, অথচ সুস্থ অবস্থায় তাদের সিজদার আহবান জানানো হয়েছিল, অতএব যারা এই কালামকে মিথ্যা বলে তাদের আল্লাহ ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবেন যা তারা জানতেও পারবে না (সূরা কলম: ৪২-৪৪)। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ যখন নিজের পরিচয় দেবেন এবং সাক বা পায়ের নলা উন্মোচিত হবে, তখন সকল প্রকৃত ঈমানদার সিজদায় লুটিয়ে পড়বে, কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক-দেখানোর জন্য সিজদা করত তাদের মেরুদণ্ড তক্তার মতো শক্ত হয়ে যাবে, ফলে তারা সিজদা করতে পারবে না (সহিহ বুখারি: ৭৪৩৯)।
মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর ইবাদত করার জন্য যথেষ্ট জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক-বিবেচনা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। মানবজীবনের প্রতিটি ভালো কাজই ইবাদত, তবে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শেখানো পদ্ধতিতেই হতে হবে। সিজদা এমন একটি ইবাদত, যা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। মানুষ জান্নাত থেকে পৃথিবীতে এসেছে এবং ইবাদতের মাধ্যমেই তাকে পুনরায় জান্নাতে ফিরে যেতে হবে।
সালাতের মধ্যে সিজদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, তোমরা তো উদাসীন, বরং আল্লাহকে সিজদা করো ও তাঁর উপাসনা করো (সূরা নাজম: ৬১-৬২)। হেদায়েতপ্রাপ্ত মানুষ বহুমুখী ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করে, তন্মধ্যে সিজদার স্থান সর্বোচ্চ। সিজদার সময় মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় এবং তার আল্লাহভীতি, বিনয় ও নম্রতা বহুগুণে বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বান্দা তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সিজদারত থাকে, অতএব তোমরা তখন বেশি বেশি দোয়া করো (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)। আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসা বর্ণনা করো এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও, আর তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো যতক্ষণ না মৃত্যু তোমার কাছে আসে (সূরা হিজর: ৯৮-৯৯)।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদার ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিসে বলেছেন। সাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বেশি বেশি সিজদা করো, কেননা তুমি যখনই আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিজদা করবে, আল্লাহ তোমার মর্যাদা এক ধাপ বাড়িয়ে দেবেন এবং একটি গুনাহ মোচন করে দেবেন (সহিহ মুসলিম: ৪৮৮)। রাবিয়া ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে জান্নাতে তাঁর সঙ্গ চাইলে নবীজি বলেন, তাহলে বেশি বেশি সিজদার মাধ্যমে এই ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো (সহিহ মুসলিম: ৪৮৯)। অন্য হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন তাঁর উম্মতকে সিজদার চিহ্নের কারণে চেহারা উজ্জ্বল থাকা অবস্থায় চেনা যাবে, যেমন কালো ঘোড়ার পালে সাদা পা-মুখওয়ালা ঘোড়াকে সহজেই চেনা যায় (মুসনাদে আহমাদ, সিলসিলা সহিহাহ: ২৮৩৬)।
আদম সন্তান পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে বটে, কিন্তু জাহান্নামের আগুন তার সিজদার স্থান স্পর্শ করবে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ যখন জাহান্নামীদের কাউকে দয়া করতে চাইবেন, তখন ফেরেশতাদের নির্দেশ দেবেন যারা আল্লাহর ইবাদত করত তাদের বের করার জন্য, আর তাঁরা সিজদার চিহ্ন দেখে তাদের চিনে নেবেন, কেননা আল্লাহ আগুনের উপর সিজদার চিহ্ন ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন (সহিহ বুখারি: ৮০৬, সহিহ মুসলিম: ১৮২)।
ঈমানদারের জন্য সিজদার গুরুত্ব অপরিসীম। মুমিন আল্লাহর পদতলে সিজদা করতে ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে দ্বিধাবোধ করবে না। কুরআনে দাউদ আলাইহিস সালামের ঘটনায় বলা হয়েছে, তিনি পরীক্ষায় পতিত হয়েছেন বুঝতে পেরে প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন এবং তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন (সূরা ছোয়াদ: ২৪)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, যাদের পূর্বে জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল তাদের কাছে কুরআন পাঠ করা হলে তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায় (সূরা বনী ইসরাইল: ১০৭-১০৯)। প্রকৃতপক্ষে সিজদার সময় দয়াশীল ও ক্ষমাশীল আল্লাহর কাছে দয়া, ক্ষমা, করুণা ও রহমত লাভের আশাই করা হয়, আর ফলাফল নির্ভর করে সিজদাকারীর অন্তরের স্বচ্ছতার উপর, যার ফায়সালাকারী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।
স্বয়ং ইবলিসও সিজদার মহিমা সম্পর্কে অবগত ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আদম সন্তান যখন সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদা করে, তখন শয়তান কাঁদতে কাঁদতে সরে গিয়ে বলে, হায়! আদম সন্তানকে সিজদার আদেশ করা হয়েছিল আর সে সিজদা করেছে, ফলে তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত হয়েছে, আর আমাকেও সিজদার আদেশ করা হয়েছিল কিন্তু আমি অবাধ্য হয়েছি, তাই আমার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হয়েছে (সহিহ মুসলিম, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)। মানুষ আল্লাহকে সিজদা করেও অন্য পাপের কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে পারে, তবে আল্লাহর দয়ায় সিজদার বরকতে একসময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু যারা জীবনে কখনো সিজদা করেনি, তারা কখনো জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে না।
যারা প্রকৃত অর্থে আল্লাহকে সিজদাকারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যারা নামমাত্র সিজদাকারী, যাদের সিজদায় আল্লাহ সন্তুষ্ট নন, তারা প্রথমে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হলেও পরবর্তীতে আল্লাহর দয়া ও রহমতে ধীরে ধীরে জান্নাতে স্থান পাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সকল প্রকার ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
মৃত ব্যক্তির নিকট কুরআন তেলাওয়াতের বিধান
ওসামা বিন আমীন
প্রিন্সিপাল, আন্- নাজম একাডেমি, কক্সবাজার।
কুরআন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে জিবরীল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ এলাহি কিতাব। এই কিতাব তেলাওয়াত করলে প্রতিটি বর্ণের বিনিময়ে দশটি করে নেকী পাওয়া যায় (তিরমিযি: ২৯১০)। তেলাওয়াতকারী ও হাফেজ জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান লাভ করবে এবং সম্মানিত ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করবে। কিন্তু এই গ্রন্থের বিধি-বিধান মূলত জীবিত ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, মৃত ব্যক্তির উপর শরিয়তের বিধান কার্যকর নয়। এই নিবন্ধে জীবিত ও মৃত ব্যক্তির নিকট কুরআন তেলাওয়াতের বিধান নিয়ে আলোচনা করা হলো।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো (সূরা আরাফ: ২০৪)। জীবিত ব্যক্তির কুরআন তেলাওয়াত শোনায় কোনো বাধা নেই, এমনকি মুমূর্ষু ব্যক্তি শুনতে চাইলে তার পাশে বসে তেলাওয়াত করা যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে কুরআন তেলাওয়াত করতে বলেছিলেন এবং সূরা নিসার একটি আয়াতে পৌঁছালে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায় (সহিহ বুখারি: ৫০৫৫, সহিহ মুসলিম: ৮০০)। অন্য হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর তেলাওয়াত শুনে তাঁর সুন্দর কণ্ঠের প্রশংসা করেছিলেন (সহিহ বুখারি: ৫০৪৮)।
মুমূর্ষু ব্যক্তির জন্য করণীয় হলো তাকে কালেমার তালকিন দেওয়া। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা তোমাদের মৃত্যুপথযাত্রীকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর তালকিন দাও (সহিহ মুসলিম: ৯১৬-৯১৭)। যার শেষ বাক্য মৃত্যুর সময় এই কালেমা হবে, সে একসময় জান্নাতে প্রবেশ করবে (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৩০০৪)। তবে এতে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না, কেননা এতে ব্যক্তি বিরক্ত হয়ে কালেমা অস্বীকারও করে বসতে পারে। শায়খ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুমূর্ষু ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী তালকিন দিতে হবে।
তবে মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াতের প্রচলিত বিধান সম্পর্কিত হাদিসগুলো দুর্বল বা জাল। মাকিল ইবনে ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, তোমরা তোমাদের মৃতদের কাছে সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করো (সুনানে আবু দাউদ: ৩১২১), কিন্তু শায়খ আলবানি রাহিমাহুল্লাহ ও শায়খ বিন বায রাহিমাহুল্লাহসহ একাধিক মুহাদ্দিস এই হাদিসকে দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন, কেননা এর সনদে অপরিচিত রাবি রয়েছেন। উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত আরেকটি হাদিস, যেখানে সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াতে জান্নাতের শরাব পানের কথা এসেছে, তা শায়খ আলবানির মতে সম্পূর্ণ জাল, কেননা এর বর্ণনাকারী মুখাল্লাদ হাদিস জালকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একইভাবে আবুদ্দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নামে বর্ণিত হাদিসটিও জাল, কেননা এতে মারওয়ান নামক একজন রাবি রয়েছেন যাকে ইমাম বুখারি, মুসলিম ও আবু হাতিম মুনকারুল হাদিস বলেছেন।
মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট সূরা বাকারা বা অন্য সূরা তেলাওয়াতের বর্ণনাসমূহও দুর্বল। শাবি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণিত হাদিসে মুজালিদ নামক রাবি রয়েছেন, যাকে ইমাম আহমাদ, বুখারি, নাসায়ি ও দারাকুতনিসহ অনেকে দুর্বল বলেছেন। ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট কুরআন তেলাওয়াতকে মাকরুহ মনে করতেন, কেননা এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিস দুর্বল এবং এটি সালাফে সালেহীনের আমল নয়।
কবরের নিকট কুরআন তেলাওয়াতের বিষয়টিও একইভাবে ভিত্তিহীন। ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি কাউকে এরূপ আমল করতে দেখিনি। ইমাম শাফেয়ি রাহিমাহুল্লাহ কবরের নিকট কুরআন তেলাওয়াতকে বিদআত বলতেন। ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মৃত্যুর পর লাশের নিকট কুরআন তেলাওয়াত করা বিদআত। তিনি আরও বলেন, কেবল আর্থিক ইবাদতের মাধ্যমেই মৃতরা উপকৃত হতে পারে, আর নফল সালাত, সিয়াম বা কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব মৃতদের কাছে পাঠানো সালাফে সালেহীনের নীতি নয়। ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মৃত ব্যক্তির নামে কবরের পাশে বা অন্য কোথাও কুরআন পাঠ করা বিদআত। উবাইদ রহমান ইবনুল আলা বর্ণিত হাদিসটিও অপরিচিত রাবির কারণে গ্রহণযোগ্য নয়, যদিও এতে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর একটি ঘটনা জড়িত রয়েছে যেখানে তিনি প্রথমে কবরের নিকট তেলাওয়াতকে বিদআত বলেছিলেন, পরে একটি বর্ণনা শুনে দ্বিধায় পড়েছিলেন— তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন তার চূড়ান্ত অবস্থান ছিল এটি মাকরুহ।
মুমূর্ষু ব্যক্তি মারা গেলে জীবিতদের কিছু করণীয় রয়েছে। প্রথমে তার চোখ বন্ধ করে দিতে হবে এবং তার জন্য দোয়া করতে হবে, কেননা তখন ফেরেশতারা সেই দোয়ায় আমিন বলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সালামার মৃত্যুর পর দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ, আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে প্রশস্ত করুন এবং সেখানে আলোর ব্যবস্থা করুন (সহিহ মুসলিম)। এরপর গোসল, কাফন, ঋণ পরিশোধ, জানাজার সালাত ও দাফন সম্পন্ন করতে হবে। মৃতের জন্য তিন দিন শোক পালন করা যায়, তবে স্ত্রী স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে, আর বিলাপ-মাতম করা যাবে না।
মৃতের জন্য দান-সদকা করা যাবে এবং এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছাবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তিনটি আমল ব্যতীত তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়— সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে (সহিহ মুসলিম)। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর কিয়ামত পর্যন্ত বান্দার সাতটি আমল প্রবহমান থাকে— দ্বীনি ইলম শিক্ষাদান, নদী-নালা প্রবাহিত করা, কূপ খনন, বৃক্ষরোপণ, মসজিদ নির্মাণ, কুরআন বিতরণ এবং এমন সন্তান রেখে যাওয়া যে মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে (মুসনাদে বাযযার)।
কুরআন তেলাওয়াত একটি মহান ইবাদত, যা জীবিত থাকাকালীন নিজে শেখা ও অপরকে শেখানোর মাধ্যমে ব্যক্তির আমলনামায় জমা হতে থাকে। কিন্তু মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে সূরা ইয়াসিন পাঠ করার যে প্রচলিত রীতি সমাজে দেখা যায়, তার কোনো সহিহ ভিত্তি ইসলামে নেই। জীবিত মুসলিম কুরআনের যেকোনো সূরা পাঠ ও শ্রবণ করতে পারে এবং তাতে নেকী পাওয়া যাবে, কিন্তু মৃত ব্যক্তির পাশে বা কবরের পাশে কুরআন তেলাওয়াত সম্পূর্ণভাবে বিদআত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে কুরআন ও সহিহ হাদিস অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
ধর্ম থেকে আরো পড়ুন