https://www.prothomalony.com/

18348

new-york

নিউইয়র্ক

নিউইয়র্কে দশকের পর দশক থাকা অভিবাসী নারীদের ওপর আইস-এর হানা

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:১৬

চিঠিতে কারণ লেখা ছিল নিতান্ত নিরীহ: নথি প্রদান। সেই চিঠি হাতে নিয়েই লোয়ার ম্যানহাটনের ২৬ ফেডারেল প্লাজায় গিয়েছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার বেশ কয়েকজন নারী। বেরোলেন হাতকড়া পরে। কেউ বাসাবাড়ির পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কেউ নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, কেউ চুলের বিনুনি করেন, কেউ প্রবীণদের সেবা দেন। নিউইয়র্কে তাঁদের বসবাস কয়েক দশকের।

নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য সিটি রিপোর্টার ও ডকুমেন্টেড-এর যৌথ অনুসন্ধান এবং আদালতে দাখিল করা হ্যাবিয়াস করপাস আবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে এভাবেই আটক হয়েছেন তাঁরা। প্রত্যেকেরই ছিল "উইথহোল্ডিং অব রিমুভাল" নামের আইনি সুরক্ষা, অর্থাৎ ইমিগ্রেশন বিচারক আগেই মেনে নিয়েছিলেন, নিজ দেশে ফিরলে তাঁদের প্রাণের ঝুঁকি আছে। কিন্তু গত ২৯ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে সেই সুরক্ষার ফাঁক গলে তৃতীয় কোনো দেশে তাঁদের দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়ার পথ খুলে গেছে। স্বাক্ষরহীন এই আদেশে আদালত ম্যাসাচুসেটসের ফেডারেল আদালতের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে, আর তিন উদারপন্থী বিচারপতি স্থগিতাদেশের বিপক্ষে ছিলেন। মূল মামলার শুনানি হবে ডিসেম্বরে।

যাঁর কাছে পরিচয় বা যোগাযোগ কিছুই নেই, তেমন একটি দেশে নির্বাসনের এই আশঙ্কা এখন আর কেবল আশঙ্কা নয়। এক ব্রংক্সবাসী নারী (বয়স ৫২) ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। ২০১৩ সালে গাম্বিয়ার ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা পান। ২৩ সেপ্টেম্বর আটকের পর আইস -এর এক কর্মকর্তা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ঘানায় উড়ে যেতে তিনি প্রস্তুত কি না। তাঁর জবাব ছিল, তিনি ঘানার কেউ নন। এক সপ্তাহ নিউজার্সির এলিজাবেথ ডিটেনশন সেন্টারে কাটিয়ে আইনজীবীর আবেদনের পর তিনি মুক্তি পেয়েছেন। ঘুম তাঁর এখনো ফেরেনি।

গাম্বিয়া থেকে ২০০৩ সালে আসা হারলেমের এক চুল-বিনুনিকারী মায়ের গল্পও প্রায় একই। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি ২৬ ফেডারেল প্লাজায় যান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ২০ বছর বয়সী মেয়ে, যিনি পাঁচ ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করেছেন। দুপুরের পর মায়ের ফোন আসে: তিনি আটক, এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে ঘানায় পাঠানো হতে পারে। পরিবারের দাবি, আদালত নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির বাইরে না সরাতে বললেও আইস তাঁকে আটলান্টা ও লুইজিয়ানা ঘুরিয়ে আবার নিউজার্সিতে ফিরিয়ে আনে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২৬ ফেডারেল প্লাজার সামনে সংবাদ সম্মেলনে মেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মায়ের কথা বলেন। পাশে ছিলেন পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানে উইলিয়ামস। পরদিন ফেডারেল বিচারক মায়ের মুক্তির আদেশ দেন। সরকারি আইনজীবীরা তাতে আপত্তি করেননি। গ্রেপ্তারের ১০ দিন পর, ২ অক্টোবর শুক্রবার নিউজার্সির ডেলানি হল ডিটেনশন সেন্টারে মা-মেয়ের দেখা হয়।

পর্যালোচনা করা ছয়টি মামলার মধ্যে মাত্র একটিতে অপরাধের ইতিহাস আছে। তাও ২০০৮ সালের এক বিশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত দণ্ড। আরেক মামলায় সরকার আদালতে জানিয়েছে, গাম্বিয়ার এক স্বাস্থ্যসেবাকর্মীকে তারা সিয়েরা লিওনে পাঠাতে চায়। ব্রংক্সের এক নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বুরকিনা ফাসোর নাগরিক, ১২ বছরের কম বয়সী তিন মার্কিন নাগরিক সন্তানের মা।

ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের তথ্য বলছে, চলতি বছরের আগস্টের শুরু পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটিতে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪৭ জনকে তৃতীয় দেশে নির্বাসিত করা হয়েছে, গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮৬। এ বছর তৃতীয় দেশে নির্বাসিতদের ৮৫ শতাংশের বিরুদ্ধে কেবল দেওয়ানি অভিবাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল, গত বছর যা ছিল ৭৩ শতাংশ।

মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের এক মুখপাত্র তৃতীয় দেশে অপসারণকে জননিরাপত্তার জন্য "অপরিহার্য হাতিয়ার" বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কেউ আদালতে গিয়ে নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকার করলে তাঁর জন্য নিরাপদ অন্য একটি দেশ খুঁজে নেওয়াতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। ফেব্রুয়ারিতে ম্যাসাচুসেটসের এক ফেডারেল আদালত তৃতীয় দেশে নির্বাসনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টে জরুরি স্থগিতাদেশ চায়, ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারকেরা তা মঞ্জুর করেন।

আফ্রিকানা-র প্রতিষ্ঠাতা আদামা বাহ বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে তাঁর ফোনে অবিরাম কল আসছে। ২০, ৪০ বছর যাঁরা আদালতে যাননি, আইন মেনে চলেছেন, সরকারের চিঠিতে ভরসা করে তাঁরাই আজ হাতকড়া পরছেন। তাঁর ভাষ্যে, এ এক ভয়ের সময়। নিউইয়র্ক লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রুপ, মেক দ্য রোড নিউইয়র্কসহ কয়েকটি সংগঠন এখন আটকদের পক্ষে একের পর এক আবেদন করছে।

আইন যাঁদের একদিন বলেছিল, "এই দেশ তোমাদের ফেরত পাঠাবে না", সেই আইনের কালি শুকানোর আগেই তাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এমন কোনো ঠিকানায়, যেখানে তাঁরা কখনো পা রাখেননি। যে শহরে তিন দশক কাটিয়ে মানুষ ঘর বাঁধে, সন্তান বড় করে, সেই শহরই কি তবে একটি চিঠির দূরত্বে অচেনা হয়ে যেতে পারে?
 

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন