https://www.prothomalony.com/
18298
north-america
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:০৩
নিউজার্সির অ্যাটলান্টিক সিটিতে সদ্য উদ্বোধন হওয়া স্থায়ী শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে বিভাজন, হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন অ্যাটলান্টিক সিটি ও সাউথ জার্সির বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় ব্যঙ্গল ক্লাবের এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজকেরা শুরুতেই স্পষ্ট করে বলেন, তাঁরা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে আসেননি। তাঁদের লক্ষ্য ইতিহাসের সত্য তুলে ধরা, শহীদ মিনারের মর্যাদা রক্ষা করা এবং কমিউনিটির ঐক্য ও সম্মিলিত অধিকারের পক্ষে কথা বলা।
কাজল সরকারের পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে
বক্তারা জানান, অ্যাটলান্টিক সিটিতে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের ইতিহাস বহু বছরের পুরনো। ২০০০ সাল থেকে বেঙ্গল ক্লাব অব অ্যাটলান্টিক সিটি এই আয়োজন করে আসছে। তবে সংগঠনটি কখনো একুশকে নিজেদের একক অনুষ্ঠান বা সম্পত্তি মনে করেনি—বরং আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে একত্র করে সম্মিলিতভাবে একুশ উদ্যাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৩ সালে অ্যাটলান্টিক সিটিতে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এলে অ্যাটলান্টিক সিটি বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ আকবর হোসেনের নেতৃত্বে বেঙ্গল ক্লাবসহ আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বিভিন্ন সামাজিক-আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা একত্র হন। ২০২৪ সালেও এই সম্মিলিত ধারা অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে সবার আর্থিক সহযোগিতা ও বেঙ্গল ক্লাবের সদস্যদের শ্রম-আন্তরিকতায় কাঠ দিয়ে ভবিষ্যৎ স্থায়ী শহীদ মিনারের আদলে একটি অস্থায়ী মিনার নির্মাণ করা হয়, যা ২০২৫ পেরিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত একই স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল—যেখানে বর্তমান স্থায়ী শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনটি কমিউনিটির প্রতিবাদ সমাবেশে পরিণত হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা প্রদান করেন লেখক সাংবাদিক ইব্রাহীম চৌধুরী, হেলাল হাসান
আলী চৌধুরী,মোহাম্মদ দিদার,শেখ আমীন,
সাঈদ দোহা,পাপলু চৌধুরী, ফারুক হোসেন,এনামুল হক, সবুর মিয়া,আকবর হোসেইন,মোহাম্মদ শাহীন,জাকির হোসেন, মনিরুল আলম বাবু,শেখ আমীন,আওলাদ হোসেইন প্রমুখ।
সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা সংস্থা ডাকটাউন সিডিসি-র অফিসিয়াল রিবন কাটিং ফ্লায়ার ও প্রেস উপকরণে বেঙ্গল ক্লাব অব অ্যাটলান্টিক সিটির নাম কমিউনিটি পার্টনার হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল ক্লাব কোনো অনাহূত সংগঠন ছিল না—মূল উদ্যোগের প্রকাশিত উপকরণেই তাদের সম্পৃক্ততা স্বীকৃত ছিল। তা সত্ত্বেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেঙ্গল ক্লাবের প্রতিনিধিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন আয়োজকেরা।
তবে বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, তাঁদের প্রতিবাদ শুধু একটি বক্তব্যের সুযোগ না পাওয়া নিয়ে নয়। তাঁদের প্রশ্ন আরও বড়—কমিউনিটির বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন, প্রেস ক্লাব, লায়ন্স ক্লাব, বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন এবং সুশীল সমাজের বৃহত্তর অংশকে কেন এই ঐতিহাসিক উদ্বোধনী প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হলো না।
অনুষ্ঠানে ঘটা আরেকটি ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। সাংবাদিক শুব্রত চৌধুরীর বরাত দিয়ে জানানো হয়, উপস্থিত জনতার সামনে অ্যাটলান্টিক কাউন্টি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের শহীদ খান তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন—"আপনি একজন ফলস সাংবাদিক, মিথ্যা লেখা লেখেন।" জবাবে শুব্রত চৌধুরী পরিষ্কার করেন, যে লেখাটি কেন্দ্র করে এই মন্তব্য করা হয়েছিল, সেটি কোনো পত্রিকার সংবাদ প্রতিবেদন ছিল না—বরং তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুকে প্রকাশিত নিজস্ব লেখা।
আয়োজকদের ভাষ্যে, অনেক মানুষের সামনে এই ঘটনা ঘটায় সাংবাদিক অত্যন্ত বিব্রত ও অপমানিত বোধ করেন, এমনকি তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বক্তারা বলেন, কোনো সাংবাদিকের লেখা নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে, তার জবাব তথ্য দিয়ে দেওয়া যায়, প্রয়োজনে প্রকাশ্যে সংশোধনও চাওয়া যায়—কিন্তু লেখার জবাব ব্যক্তিগত অপমান দিয়ে হতে পারে না। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়, ভাষার অধিকার ও মত প্রকাশের অধিকারের স্মারক শহীদ মিনারের সামনেই এই ঘটনা ঘটেছে।
আয়োজকদের প্রতিনিধিরা যাঁরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে বলা হয়, অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়নি এবং ভাষা শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতাও পালন করা হয়নি। পরবর্তীতে এ নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা উঠলে ভিন্নভাবে তা প্রচার করা হয় বলে জানান বক্তারা, তবে তাঁরা সেই ভাষ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁদের দাবি, যদি সত্যিই জাতীয় সংগীত ও শোক পালন করা হয়ে থাকে, তাহলে তার সম্পূর্ণ ভিডিও বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
সাংবাদিক সম্মেলনে চারটি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়ঃ প্রথমত, শহীদ মিনারের পূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করে ২০২৩ থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও সংগঠনের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে শহীদ মিনার ও একুশের মতো সর্বজনীন কর্মসূচিতে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠন, প্রেস ক্লাব, লায়ন্স ক্লাব, বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্যান্য সক্রিয় কমিউনিটি প্রতিনিধিদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা ও সমন্বয় করা হোক।
তৃতীয়ত, শহীদ মিনারকে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা সীমিত গোষ্ঠীর একক কৃতিত্ব বা নিয়ন্ত্রণের প্রতীক না বানিয়ে পুরো কমিউনিটির সর্বজনীন স্মৃতিসৌধ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হোক।
চতুর্থত, ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক মতবিরোধ শহীদ মিনারের বাইরে রেখে প্রয়োজনে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হোক।
বক্তারা স্পষ্ট করেন, তাঁরা কাউকে শত্রু ঘোষণা করতে আসেননি, কোনো সংগঠনের অবদান খাটো করতেও আসেননি, এবং পাল্টা বিভাজনও চান না। তাঁদের ভাষায়, "আমরা সংঘাত চাই না—সম্মান চাই। আমরা আধিপত্য চাই না—অংশগ্রহণ চাই। আমরা একক কৃতিত্ব চাই না—ইতিহাসের যোগ্য স্বীকৃতি চাই। আমরা বিভাজন চাই না—ঐক্য চাই।"
সম্মেলনের শেষে বক্তারা সতর্ক করে বলেন, যে শহীদ মিনার কমিউনিটির ঐক্যের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, সেই মিনারকে ঘিরেই যদি আরও বিভক্তি তৈরি হয়, তাহলে স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়ালেও একুশের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাঁরা আগামী একুশে ফেব্রুয়ারিতে একই শহীদ মিনারের সামনে সবাইকে একত্রে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নয়, একটি সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস এবং একটি ঐক্যবদ্ধ কমিউনিটিও রেখে যাওয়া প্রয়োজন।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন