https://www.prothomalony.com/

14091

bangladesh

বাংলাদেশ

দলীয় ছত্রছায়ায় সহিংসতার পুনর্জাগরণ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ ০১:০৪

বাংলাদেশে সহিংসতা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে সহিংসতা হঠাৎ করেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাতে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আবারও বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। কোথাও পিটিয়ে হত্যা, কোথাও দলবেঁধে হুমকি, আবার কোথাও দিনের আলোতে জমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে। খবরে আমরা এসব দেখছি। দেখছি আর বিস্মিত হচ্ছি না—কারণ ঘটনাগুলো পরিচিত। এই পরিচিত চেহারার ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছায়া—দলীয় ছত্রছায়ায় লালিত অপরাধচক্র।

এই দেশ অনেক কিছু সহ্য করেছে। ঘূর্ণিঝড়, দুর্যোগ, অরাজকতা—সবই এসেছে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগটি হলো দলীয়ভাবে পুষ্ট হওয়া সহিংসতামুখী সংস্কৃতি। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা কিছু লোক একসময় হয়ে ওঠে স্থানীয় 'ভয়'। আজকের যেসব সহিংস ঘটনার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে, তার পেছনের চরিত্রগুলোর খোঁজ নিতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়। ছাত্র সংগঠনের প্রাক্তন নেতা, উপজেলা কমিটির সাবেক সদস্য, কারো ছোট ভাই, কারো দলের ‘আন্তরিক কর্মী’।

এই লোকগুলো কেউই আকাশ থেকে পড়ে না। দলের ব্যানারে বড় হয়, নেতাদের ছায়ায় দাঁড়ায়, মিছিলে স্লোগান দেয়, পোস্টারে ছবি থাকে। প্রথমে পেছনে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়, পরে সামনে এসে হুমকি দিতে শুরু করে। এদের কাজ শুরু হয় স্লোগান দিয়ে, শেষ হয় চাঁদাবাজি আর জমি দখল দিয়ে।

অথচ, যখন তারা ধরা পড়ে—তখন দল ‘অবাক’, ‘লজ্জিত’, ‘দায়ী নয়’। এ যেন, গাছ বুনে ফল ফলালাম, আর বললাম ফলটি তো গাছ নিজেই করেছে! এই দায় এড়িয়ে যাওয়া আসলে একটা বড় রাজনৈতিক প্রতারণা।

বাংলাদেশে বিগত তিন দশকের ইতিহাসে দেখা গেছে, বালু মহাল দখল, নদীর পাড় বুজিয়ে বাড়ি বানানো, বন জঙ্গল কেটে ফেলা—এসবের পেছনে কোনো না কোনো ‘সাহসী রাজনৈতিক কর্মীর’ হাত থাকে। সে কখনো উপজেলা সভাপতি, কখনো জেলা যুবনেতা, কখনো কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগঠনের সাবেক। এই লোকগুলোই সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন একধরনের অসহায় নিরবতা পালন করে। অনেক সময় দেখা গেছে, মামলা হলেও সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পর্যন্ত চাপের মুখে পড়ে যান। তদবির হয় উপরের স্তর থেকে। তখন আবার বলা হয়—“এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।”

কিন্তু আমরা তো জানি, এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোই একত্র হয়ে একটি ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি তৈরি করেছে—যেখানে রাজনীতি মানে ক্ষমতা, ক্ষমতা মানে দখল, আর দখল মানেই নিঃসন্দেহে সহিংসতা।

রাজনৈতিক দলগুলো এই সংস্কৃতিকে যতদিন প্রাথমিক পর্যায়েই অস্বীকার করে, ততদিন এটি থেকে উত্তরণের পথ খোলা থাকে না। আসলে, দলের ভেতর যেসব সহিংস, দখলদার ও অপরাধী প্রকৃতির লোক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে দূরে সরানোই হতে পারে প্রথম প্রয়োজন। শুধুমাত্র তৃণমূলের শান্তিপ্রিয় কর্মীদের দিয়ে দল শক্ত হয়—এই সত্যটা বুঝতে হবে।

আজ বাংলাদেশ এমন একটি সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়ানকভাবে বাড়ছে। জনগণ বিচার না পেয়ে রাস্তায় আইন কায়েম করতে চাইছে। আর অপরদিকে কিছু লোক দলীয় পরিচয়ে আইনকে তাচ্ছিল্য করছে, প্রশাসনের মুখে চোখ রাঙিয়ে দখল করছে জমি, বাড়ি, দোকানপাট।

এই দুই প্রান্তিক বাস্তবতার মাঝে চাপা পড়ে যাচ্ছে নাগরিক নিরাপত্তা, সাধারণ মানুষের মর্যাদা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা। এটি একটি ভয়ানক জায়গা। আমরা যারা লেখালেখি করি, কথা বলি—তাদের দায় এই ভয়ঙ্কর জায়গাটাকে চিহ্নিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর এখন দায়িত্ব নিজেদের ভেতরের সহিংস, অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিদের ছেঁটে ফেলা। দায় স্বীকার করে শুদ্ধি অভিযান চালানো।

দল যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের দল হয়ে থাকতে চায়, তবে তাকে জনগণের ভয় নয়, ভালোবাসার উৎস হতে হবে। আর সে ভালোবাসা আসে দায়িত্বশীলতা থেকে, জবাবদিহি থেকে—not from power, but from principle.

বাংলাদেশের মানুষের চোখের সামনে অনেক কিছু ঘটেছে। এবার তারা দেখছে— কে দায়িত্ব নিচ্ছে আর কে অস্বীকার করছে। স্মরণ রাখতে হবে, ইতিহাস ক্ষমা করে, কিন্তু ভুলে না। ক্ষমতার চেয়েও বড় কথা— জবাবদিহির সাহস।
সেই সাহস ক’জনের আছে, সময় বলে দেবে।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন