https://www.prothomalony.com/

9841

bangladesh

বাংলাদেশ

রিমেলের ম ন্দ গ তি ই ভাসালো উপকূলের বিস্তৃত এলাকা, দীর্ঘ সময় বয়ে যাওয়া ঘূর্ণি রেখে গেছে বিশাল ক্ষ তে র দা গ

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪ ১১:০৭

উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এগিয়ে আসা হাওয়ার বাধা ঠেলে দ্রুত গতিতে এগোতে পারছিল না ‘রিমাল’। ‘রিমালে’র জেরে রোববার রাতে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গিয়েছে। তবে ‘রিমাল’ নিজে এগোচ্ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৬ থেকে ১৩ কিলোমিটার বেগে। এই মন্দগতির কারণেই ল্যান্ডফলের ১৪ ঘণ্টা পরেও ‘অতি তীব্র’ ঘূর্ণিঝড় সামান্য কিছুটা শক্তি খুইয়ে ‘ঘূর্ণিঝড়ে’র চেহারা নিয়েছিল। সাধারণত ল্যান্ডফলের পরে এই সময়ের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কমতে কমতে তা গভীর নিম্নচাপ বা আরও দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়। কিন্তু ক্ষমতায় ‘সুপার সাইক্লোন’ আইলা বা উম্পুনের তুলনায় অনেকটা খাটো হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বড় প্রভাব ফেলতে পেরেছে ‘রিমাল’। ২৬ মে রোববার রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ  পটুয়াখালি জেলার মংলার কাছাকাছি ‘তীব্র ঘূর্ণিঝড়’ হিসেবে ল্যান্ডফল করে ‘রিমাল’।

উপকূলে দীর্ঘ সময় ঘূর্ণি বয়ে দিয়ে থেমেছে রিমাল। তবে ঝড় বিদায় নিলেও রেখে গেছে ক্ষতের দাগ। ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে দিগ্‌ভ্রান্ত মানুষ। কীভাবে আবার মাথা তুলে দাঁড়াবেন, ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। রিমাল তার ঘূর্ণিতে যতটা না ঘায়েল করেছে, এর চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ঝড়ের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টির কারণে। সব মিলিয়ে উপকূলের অর্ধকোটি মানুষের দুই চোখে এখন অমাবস্যা।

বঙ্গোপসাগর থেকে ডাঙ্গায় উঠে আসার সময় প্রায় ৭ ঘণ্টা ব্যাপী প্রচণ্ড শক্তির ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবলীলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশের উপকূলবর্তী বিশাল অঞ্চল। প্রায় দ্বিতল ভবনের সমান উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত এবং তছনছ হয়ে গেছে বহু জনপদ, ঘরবাড়ি, বেড়িবাঁধ,গাছপালা, মাছের ঘের, ফসলের ক্ষেত, দোকানপাট। ২৭ মে বিকাল পর্যন্ত সাত জেলায় প্রাণহানি ঘটেছে অন্তত:১৪ জনের। সরকারি হিসাবে ১৯ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাড়ে ৩৭ লাখ মানুষ। পৌনে ৩ কোটি গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ছেদ পড়েছে। ১৫ হাজার মোবাইল টাওয়ার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

এছাড়া খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা জোনের ৬১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে অর্ধলক্ষাধিক মাছের ঘের। দেড় লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বুক চিতিয়ে ঝড়ের প্রলয়ংকরী তাণ্ডবের উন্মত্তা খাটো করে দেয়া সুন্দরবন ১০ ফুট পানির নীচে তলিয়ে গেছে। হরিণসহ অনেক প্রাণীর লাশ ভাসছে সুন্দরবনের নদনদীর পানিতে। রোববার রাত পৌনে নয়টার দিকে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতির বাতাসের শক্তি নিয়ে বাগেরহাটের মোংলার কাছ দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও পটুয়াখালীর খেপুপাডা উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র আঘাত হানতে শুরু করে। ৪০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এই ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব ছিল ২০০৭ সালের সিডারের পরে সর্বোচ্চ। ধীরে ধীরে দীর্ঘক্ষণ ধরে ঝড়টি স্থলভাগে উঠে আসার অগ্র-পশ্চাতে মধ্যরাতে ঘূর্নিতান্ডবের সাথে জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুরের বেশ বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

রিমালের তাণ্ডবে ১ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৫ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. মহিববুর রহমান। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে তিনি এ কথা জানান। 

বাগেরহাটে রিমালের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে গাছ। তলিয়েছে ঘরবাড়ি। খুলনায় পানিবন্দি মানুষ।

প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়েছে দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলা। দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার বেশি এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ জন। দেড় লাখের বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ও আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে ৩৭ লাখ মানুষ। এ ছাড়া বসতবাড়ি, রাস্তায় উপড়ে পড়েছে গাছ। জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক গ্রাম। ভেসে গেছে হাজার বিঘার চিংড়ি ঘের। দিনভর ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভূমিধসেরও।

 ঘূর্ণিঝড় রিমালে মৃত্যুবরণ করেছে ১৪ জন। বরিশালে তিন, ভোলায় তিন, পটুয়াখালীতে তিন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও লক্ষ্মীপুরে একজন করে। যদিও সরকারিভাবে সোমবার বিকালে জানানো হয়েছে ১০ জনের মৃত্যুর কথা।

ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রভাগ ২৬ মে রোববার রাত ৮টার দিকে উপকূলে আঘাত হানে। পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী দিয়ে উপকূল অতিক্রম শুরু করলেও রাতভর শুধু তাণ্ডবই চালায়। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার, যা ঝোড়ো হাওয়া আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছিল ঘূর্ণিঝড়টি ভয়ংকর হয়ে ওঠার কারণে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৯ নম্বর মহাবিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়েছিল। সারা রাত তাণ্ডব ঘটিয়ে সোমবার সকালের দিকে দুর্বল হতে থাকে রিমেল। এ অবস্থায় সকালে সমুদ্রবন্দরগুলোয় ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। এরপর সারা দিনই রিমালের প্রভাবে বিভিন্ন জেলায় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টি ঝরতে থাকে। সঙ্গে চলে তীব্র ঝোড়ো বা দমকা হাওয়া।

ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ২৭ মে সোমবার বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান বলেন, প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও চট্টগ্রামে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হচ্ছে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা, ফেনী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও যশোর। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার সংখ্যা ১০৭ এবং ইউনিয়ন ও পৌরসভা ৯১৪টি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬। ৩৫ হাজার ৪৮৩টি সম্পূর্ণ এবং আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২টি ঘরবাড়ি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, উপকূলীয় এলাকাগুলোয় ৯ হাজার ৪২৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্র ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ লাখের বেশি লোক আশ্রয় নিয়েছে। গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়াসহ পশুর সংখ্যা ৫২ হাজার ১৪৬। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের অনুকূলে ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫ জেলায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ নগদ টাকা, ৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য কেনার জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ও গোখাদ্য কেনার জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রমসহ দুর্যোগ-পরবর্তী অন্য সব কর্মকাণ্ডেও সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন প্রতিমন্ত্রী।

সরকারি হিসাবে দেশের অন্তত ১৯ জেলার মানুষকে কাঁদিয়েছে রিমাল। কেড়ে নিয়েছে ১৪ প্রাণ। বিধ্বস্ত হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, গাছপালা। গ্রামীণ সড়ক আর বেড়িবাঁধ ভেঙে একাকার। পানির নিচে ভাসছে গ্রামের পর গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। তলিয়ে গেছে মাছের ঘের, মাঠের ফসল। ‘বিপদের ঢাল’ সুন্দরবনও আঘাত থেকে বাঁচেনি। বিদ্যুৎ নেই; নেই মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক। ঘরে নেই খাবার। সবচেয়ে বেশি বিপদে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। দুই দিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার খেয়ে টিকে আছে মানুষ। সব মিলিয়ে উপকূলে নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়। এমন বিপন্ন মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দ্রুত সরকারি-বেসরকারি মানবিক সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিগগিরই ঘূর্ণিঝড় রিমালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাবেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন