https://www.prothomalony.com/
9003
bangladesh
ব্রিটিশ শাসনামলে ঐতিহাসিক টংক আন্দোলন ও হাজং বিদ্রোহের নেত্রী কুমুদিনী হাজং (১০২) মারা গেছেন। ২৩ মার্চ শনিবার দুপুরে নিজ বাড়ি নেত্রকোনার দুর্গাপুর সীমান্তে বহেরাতলীতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কুমুদিনীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার স্বজন বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক গীতিকার সুজন হাজং।
পল্টন হাজং বলেন, কুমুদিনী হাজং বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন। তার এক মেয়ে ঢাকায় থাকেন। পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনেরা আসার পর রোববার সকালে সোমেশ্বরী নদীর বিজয়পুর ঘাটে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্নের কথা রয়েছে।
কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মনি সিংহ’র নেতৃত্বে টংক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয় দুর্গাপুরের হাজং সম্প্রদায়। এরই অংশ হিসেবে কুমুদিনী হাজংয়ের স্বামী লংকেশ্বর হাজং অন্দোলনে জড়িত হন।
১৯৪৬ সালে ৩১ জানুয়ারি বহেরাতলী গ্রামে লংকেশ্বরের বাড়িতে হানা দেয় ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর সশস্ত্র সেনারা। এ সময় স্বামীর অবস্থান জানাতে না চাইলে কুমুদিনীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নারী নেত্রী রাশিমনি হাজংয়ের নেতৃত্বে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
কুমুদিনীকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে নৃশংসভাবে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে রাশিমনি ও সুরেন্দ্র হাজংসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। পরে সেনারা কুমুদিনীকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
ওই ঘটনার পর সংজ্ঞাহীন কুমুদিনী হাজংকে গ্রামবাসীরা বহেরাতলীর অদূরে গভীর পাহাড় ঘেরা আড়াপাড়া অরণ্যে কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মনি সিংহ-এর গোপন আস্তানায় নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন কুমুদিনীর স্বামী ও ভাসুররা।
ঘটনায় সরকার হাজং অধ্যুষিত গ্রামগুলোর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সরকার বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলাও দায়ের করে। মামলায় কমরেড মনি সিংহ, লংকেশ্বর হাজং তাঁর তিন ভাই ও কুমুদিনী হাজংসহ অনেক হাজং আন্দোলনকারীকে আসামি করা হয়।
সে সময় সুসং অঞ্চলের প্রায় সকল হাজং পরিবারকেই পুলিশের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে ফেরারী জীবন যাপন করতে হয়েছিল। কুমুদিনী হাজং পুলিশের অত্যাচার ও গ্রেফতার এড়াতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার লক্ষ্মীকুড়া গ্রামে বলেশ্বর হাজং এর বাড়িতে আত্মগোপন করেন। কেউ যেন তাকে চিনতে না পারে সেজন্য বলেশ্বর হাজংয়ের পরামর্শে কুমুদিনী হাজংয়ের নাম বদলে ‘সরস্বতী’ রাখা হয়েছিল। আন্দোলনের মুখে ১৯৫০ সালে বিলুপ্ত হয় টংক প্রথা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে কুমুদিনীর স্বামী লংকেশ্বর হাজং মারা যান। তাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে লমিন হাজং থাকেন বিজয়পুরের গুচ্ছগ্রামে। মেজ ছেলে অর্জুন হাজং নিজ গ্রামে। ছোট ছেলে সহদেব হাজং মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতে চলে যান। বড় মেয়ে মেনজুলি হাজং মানিকগঞ্জে ও ছোট মেয়ে অঞ্জুলী হাজং থাকেন ঢাকায়।
সমাজসেবায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে কুমুদিনী হাজংকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেয় বাংলা একাডেমি। এ ছাড়া তাঁকে অনন্যা শীর্ষদশ (২০০৩), আহমদ শরীফ স্মারক (২০০৫), কমরেড মণি সিংহ স্মৃতি পদক (২০০৭), সিধু-কানহু-ফুলমণি পদক (২০১০), জলসিঁড়ি (২০১৪) ও হাজং জাতীয় পুরস্কার (২০১৮) প্রদান করা হয়।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন