https://www.prothomalony.com/

18274

north-america

উত্তর আমেরিকা

কেনেডি থেকে ভিঞ্চি —এক উড়ালের গল্প ( পর্ব ২)

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:১৯

আমি ইতিহাসের ছাত্রী। পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস আমায় খুব টানে।আজ রওনাহয়েছি এক অবাক করা দেশের উদ্দেশ্যে। অনেক গল্প আছে দেশটিকে ঘিরে। শহরে-বন্দরেঘুরতে ঘুরতে কিংবা দেখতে দেখতে সেই গল্পগুলো, গল্পের ছবিগুলো সবার সাথে শেয়ার করবো।যাতে আপনিও একঝলক দেখে নিতে পারেন দেশটি আসলে কেমন। গল্পের মানুষগুলো আদতেকেমন ছিলো। 

আজ ২ অগাস্ট, ২০২৬ সাল। যাত্রা শুরুর দিন। প্রথম গন্তব্য কনি আইল্যাণ্ড থেকে জেএফকেআন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। জানজট না থাকলে আমার বাসা থেকে আধাঘন্টার পথ। অমিতউবার কল করে দিয়েছে। আমাদের উবারে তুলে,  বিদায় জানিয়ে, তবেই সে নিজের বাসায় ফিরেগেছে। আমাদের ইরানী উবার ড্রাইভার আমাদের নিয়ে মোটামুটি অনটাইমেই বিমানবন্দরেপৌঁছে গেলেন। যাত্রাপথে ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল ত্রিমুখী লড়াই নিয়ে হালকাপাতলাআলাপ হল তার সাথে। ইরান, আমেরিকা এবং ইসরাইলের মধ্যকার এই ত্রিমুখী সংঘাত যেএকটি কৌশলগত খেলা তা সবার কাছেই এখন ওপেন সিক্রেট।  বাহ্যিকভাবে আমেরিকা ওইসরাইল একপক্ষে থাকলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ আলাদা।বাকস্বাধীনতার দেশেও আমরা যেভাবে বাকরুদ্ধ হয়ে আছি ইরানী চালকের সাথে আলোচনায়সেই বিষয়টি আমাদের উভয়কেই বিব্রত করে তুলেছিল। 

যাইহোক, ভেতরে গিয়ে আমরা আইটিএ’র প্যাসেন্জার সার্ভিস এরিয়ার লাইনে দাঁড়ালাম।সেখানে যাত্রীদের বুকিং, লাগেজ ওয়েটিং, ট্যাগিং এবং বেল্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। 

বাবুলের ক্যারিঅনের ওজন যথাযথ থাকলেও আমারটা বেশ ভারী ছিল। আমি শঙ্কিত ছিলাম, যাতে আমার ক্যারিঅনের উপর চেক-ইন-অফিসার কো বদনজর না লাগ যায়।এদিকে, পিঠেরউপরে যে ব্যাকপ্যাকটা বহন করছি, সেটিও মোটামুটি প্যাক্ট। যাকে বলে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাইঅবস্থা।

আমাদের পালা আসতেই  চেক-ইন-অফিসার মেলিসা’র দিকে আমাদের পাসপোর্ট দুটো এগিয়েদিলাম। যতক্ষণ তিনি তার সামনের কম্পিউটারে কাজ করছেন, আমি নিরিহ মুখে দাঁড়িয়েআমার সম্ভাব্য দূর্গতির কথা ভাবছি। বুকিং শেষ করে, বোর্ডিং পাস প্রিন্ট করে, তিনি আমারক্যারিঅনের দিকে নজর দিলেন। ক্যারিঅনকে কনভেয়র বেল্ট স্কেলের উপর তুলে দিতে নির্দেশদিয়ে তিনি স্ক্রিনে চোখ রাখলেন। আমিও ‘আল্লাহ ভরসা’ বলে স্কেলের উপর লাগেজ রাখলাম।আঁড়চোখে স্ক্রিন দেখলাম। ইনডিকেটরের কাটা ওভারওয়েট নির্দেশ না করলেও প্রেগনেন্টনারীর মতো ক্যারিঅনটা তার ঢাউস-পেট নিয়ে ড্যাব ড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।তার সেই অসহায় চাহনি আমাকে যারপর নাই বিব্রত করতে লাগলো।

সুন্দরী চেক-ইন অফিসার  মুখ তুলতেই আমি তার দিকে তাকিয়ে মধুরতর হাসলাম। আমাকেবিস্মিত করে দিয়ে তিনিও গালে টোল ফেলে হাসলেন। তারপর দরাজ গলায় বললেন, “তোমারক্যারি-অনটা ফ্লাইটের ওভারহেড বিনে ঢোকাতে তুমি হিমশিম খাবে। তাছাড়া আমাদের প্যাক্টফ্লাইটে তুমি হয়তো পর্যাপ্ত জায়গাও পাবে না। তুমি কি চাও আমি তোমার লাগেজটা চেক-ইনকরে দেই?”

আমি নিরীহ কণ্ঠে জানতে চাইলাম,  আমাকে কী এরজন্য পে করতে হবে? 

মেলিসা মিষ্টি হেসে বললেন, “না, পে করতে হবে না। ফ্রি অফ কস্ট।” 

আমার বুক থেকে বিশাল পাথর নেমে গেলো। আহা কী শান্তি! বললাম, ‘তথাস্তু। ইউ আর সোকাইন্ড। থ্যাঙ্কইউ সো মাচ মেলিসা।’

তারপর বাবুলের পালা। তার লাগেজে কোনো ঘাপলা নেই। তবুও মিস মেলিসা বাবুলেরক্যারিঅনটাও চেকিংয়ের প্রস্তাব দিয়ে বললেন, “এটাও চেকিং করতে পারো। লাগেজ হাতে নাথাকলে তোমরা রিলাক্সভাবে ফ্লাইটে উঠতে পারবে।”

সে আমাদের ক্যারিঅনের গলায় ট্যাগ লাগিয়ে দিল। ব্যাগেজ অ্যাক্সেপটেনস পক্রিয়া শেষহতেই চেকড ব্যাগেজ প্রসেসিং শুরু হল। সুটকেস দুটো ব্যাগেজ ড্রপ কনভেয়র বেল্টের উপর উঠেআমাদের দিকে যেনো চোখ টিপে দিলো। তারপর নাচতে নাচতে ভেতরের মেক-আপ-এরিয়ায়চলে গেলো। আমরা যখন ফ্লাইটের সীটে বসে রোমের দিকে যাবো, তারাও প্লেনের পেটে বসে, অন্য লাগেজদের সাথে সুখদুখের গল্প করতে করতে রোম পৌঁছে যাবে। 

নিউ ইয়র্ক থেকে রোম। আমরা যাচ্ছি, আইটিএ এয়ারওয়েজের ননস্টপ ফ্লাইটে।যথাসময়েবোর্ডিং শুরু হতেই   ফ্লাইটে উঠে বসলাম। সৌভাগ্যবশত জানালার পাশের কাংখিত সীটটাইআমাকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। মনে মনে অমিতকে ধন্যবাদ দিলাম। সে যখনই প্লেনের টিকেটকাটে আমার জন্য জানালার পাশে সীট নেয়ার চেষ্টা করে। 

বিকাল ৪:৪৫।  ‘ইতালিয়া ত্রাসপোর্তো আ-এরে-ও’ তার নির্ধারিত সময়ের খানিকটা পড়ে  জেএফকে ছাড়ল। প্লেন ছাড়ার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ হতেই ককপিট থেকে গমগমে কণ্ঠে পাইলটেরএনাউন্সমেন্ট ভেসে এলো, 'সিনিওরে এ সিনিওরি, বেনভেনুতি আ বোরদো...'। ইতালিয়ান নাজানলেও ঘোষনাটা বুঝতে তেমন কষ্ট হল না। 'বেনভেনুতি' শব্দটা বুকে লাগলো — যেন কেউঅনেক দূর থেকে বলছে, “এসো। রোম তোমায় ডাকছে।” 

এরপর এলো ইংরেজি এনাউন্সমেন্ট। আট ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের ফ্লাইট। বাইরে এখন নিউইয়র্কের সন্ধ্যা।আমরা পরদিন সকাল ৭:০৫ এ টাইবার নদীর তীরের দেশ রোমে নামবো।

ডিনার শেষ হতেই প্লেনের ভেতরের বড়  আলোগুলো নিভে গেলো। মাথার উপরের আলোতেকিছুক্ষণ বই পড়ে, কিছুক্ষণ ফোন স্ক্রল করতে করতে একসময় চোখ লেগে এলো। এভাবেইঘুমে-জাগরণে আমার আট ঘণ্টার আকাশযাত্রা শেষ হল। ক্রাফ্ট মাটি স্পর্শ করতেই এয়ারক্রুরাআমাদের ইতালিতে স্বাগত জানালেন। নতুন সকাল, নতুন দেশে! 

গেট খুলতেই আমরা ক্রাফ্ট থেকে নামলাম।  ছুটলাম ব্যাগেজ ক্লেইম ক্যাসোরলের দিকে।লাগেজের জন্য অপেক্ষা করছি। ততক্ষণে আমার কর্ণকূহর আশেপাশের ইতালিয়ান শুনতেশুনতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। 

ক্যাসোরল থেকে লাগেজ সংগ্রহ করে ইতিউতি দেখছি। কারন, ভাইকিং সি’র ক্রুদের এখানেইথাকার কথা। ওমা, ঠিক আমার কানের পাশেই কেউ একজন ইতালিয়ান একসেন্টের ইংরেজিতেসম্ভাষণ জানালেন। তাকিয়ে দেখি একজন ইতালিয়ান নারী সাদা অক্ষরে ভাইকিং লেখা লালটিশার্ট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার হাতের লম্বা লাঠির মাথায়ও ভাইকিং এর ট্রেডমার্কযুক্তপতাকা দুলছে। দেখে যারপর নাই আশ্বস্ত হলাম। সুমিত অভয় দিয়ে বলেছিল, “আম্মু, তুমিচাইলেও এয়ারপোর্ট থেকে হারাতে পারবে না। ভাইকিংয়ের লোকজন তোমাকে ঠিক খুঁজে নেবে।”

আসলেই তাই। দেখলাম, আমাদের ফ্লাইটেরই জনাদশেক কাপল ভাইকিং লেখা পতাকার নিচে  এসে দাঁড়ালেন। তাদের লাগেজেও ভাইকিংয়ের লাল লেদারের ট্যাগ। এতক্ষণে আমরাআমাদের সহযাত্রীদের দিকে তাকিয়ে পরিচয়ের হাসি হাসলাম। ধীরে ধীরে ভাইকিং পরিবারেরসদস্য সংখ্যা বাড়তে শুরু করলো। ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে, ভিন্ন ভিন্ন ফ্লাইটে আসা যাত্রীরাওভাইকিং যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত স্থানে জড় হতে শুরু করলেন। ভাইকিং ট্যুরবাস আমাদের  সবার চেকইন এবং ক্যারিঅন লাগেজ সংগ্রহ করে নির্ধারিত লাগেজ ভ্যানে নিয়ে গেলো। এখনথেকে আমাদের রক্ষণাবেক্ষণের সমস্ত দায়িত্ব ভাইকিং ক্রুদের উপর ন্যাস্ত। সমস্ত লাগেজেরদায়িত্ব এখন তাদের। আমরা ক্রুজে উঠে যারযার নির্ধারিত রুমের সামনে লাগেজ ফিরে পাবো।  পার্সনাল আইটেম বলতে আমি শুধু আমার ব্যাকপ্যাকটি কাঁধে নিয়ে ফুরফুরা মেজাজে অপেক্ষাকরতে লাগলাম।আমাদের গাইড বললেন, বাইরে বেশ কয়েকটি ট্যুর বাস অপেক্ষা করছে।আমাদেরকে পর্যায়ক্রমে সেইসব বাসে করে ডকে নিয়ে যাওয়া হবে। যেখানে আমাদের জন্যভাইকিং সি ক্রুজশীপ নোঙ্গর করে অবস্থান করছে। প্রতিটি বাসেই একজন করে গাইড থাকবেন।যিনি আমাদেরকে রোম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা দেবেন। পথিমধ্যে তারা আমাদের কিছু দর্শনীয়স্থান দেখাবেন এবং তার গল্প বা ইতিহাস তুলে ধরবেন। 

আমাদের ঠিক পাশেই দেখলাম আরেকদল যাত্রি।তাদের সবার গায়ে প্রিন্সেস ট্যাগ লাগানো।বুঝলাম, আমাদের প্রতিবেশীরা প্রিন্সেস ক্রুজের যাত্রী। 

নির্ধারিত বাসে উঠে বসতেই, বাসের ড্রাইভার এবং একজন ইতালিয়ান গাইড আমাদের সম্ভাষণজানিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। আমাদের গাইড জানালেন, ভাইকিং ক্রুজশীপ যেখানে নোঙ্গরকরেছে, সেই বন্দরের নাম সিভিটাভেক্কিয়া। সিভিটাভেক্কিয়া বন্দর রোম শহর থেকে ৮০ কিমিউত্তর-পশ্চিমে, টাইরেনিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত। এই টাইরেনিয়ান সাগর ভূমধ্যসাগরেরইএকটা অংশ। ইতালিয়ান উপদ্বীপের বিস্তৃতি ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। তিন দিক থেকে সমুদ্র ঘিরেরেখেছে দেশটাকে। পশ্চিমে টাইরেনিয়ান, দক্ষিণে আয়োনিয়ান এবং পূর্বে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর।উপদ্বীপের মধ্যখানটির প্রায় পুরোটাই দখল করে আছে অ্যাপেনাইন পর্বতমালা। 

পথে যেতে যেতে, গাইড সোফিয়া’র ধারা বর্ননা শুনতে শুনতে আমাদের চোখের সামনের থেকেযেনো একটা পর্দা সরে গেলো। উন্মোচন হল সেই প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের দৃশ্যপট। রোমাঞ্চ, ক্ষমতা, যুদ্ধ এবং নাটকীয় পতনে ভরপুর এক মহাকাব্য!

উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন