https://www.prothomalony.com/
18278
north-america
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:৩৬
"থিয়েটার আসলে এক গভীর শৃঙ্খলার নাম। প্রবাসের এই ব্যস্ত জীবনে আমরা যে যার মতো জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। এর পাশাপাশি শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়া সত্যিই কঠিন। কিন্তু থিয়েটারের প্রতি যে ভালোবাসা আর আত্মার টান, সেই টানেই শত ব্যস্ততা আর ক্লান্তি ভুলে আমরা আলো-আঁধারির মঞ্চে বারবার ফিরে আসি।" থিয়েটারচর্চা, নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা এবং মঞ্চে প্রত্যাবর্তনের গল্প নিয়ে কথাগুলো বলেছেন বিশিষ্ট নাট্যজন খাইরুল ইসলাম পাখি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নিয়মিত সাপ্তাহিক সম্প্রচার "টক অব দ্য উইক" অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন রোকেয়া দীপা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন এইচ বি রিতা।
ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে চার দশকের বেশি সময় ধরে যুক্ত খাইরুল ইসলাম পাখি। অভিনয়, মঞ্চনির্দেশনা, আবৃত্তি ও উপস্থাপনায় নিজেকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তিনি নিউইয়র্কভিত্তিক নাট্য সংগঠন 'থিয়েটার ৭১'-এর সভাপতি এবং প্রেজেন্টার্স প্ল্যাটফর্ম অব বাংলাদেশের (পিপিবি) সক্রিয় সংগঠক হিসেবে প্রবাসে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন।
দীর্ঘ দুই বছর পর মঞ্চে ফেরা এবং মাসুম রেজার রচনায় নিজের নির্দেশিত আলোচিত নাটক 'নেমেসিস' প্রসঙ্গে খাইরুল ইসলাম পাখি বলেন, "বিরতিটা ইচ্ছাকৃত ছিল না। প্রবাসে নতুন দল গুছিয়ে নেওয়া, একাধিক কর্মশালার মাধ্যমে নতুন ছেলেমেয়েদের তৈরি করা এবং সর্বোপরি একটি মানসম্মত কাজের জন্যই এই প্রস্তুতির সময়টুকু লেগেছে। নেমেসিস নাটকে প্রবাসে প্রথমবারের মতো মঞ্চে এসেছেন গুণী অভিনেত্রী বন্যা মির্জা। আর নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে শান্তিকে আমরা যুক্ত করেছি। বন্যা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত শিল্পী হওয়ায় কাজটা অনেক সহজ হয়েছে, অন্যদিকে শান্তি কাদামাটির মতো আন্তরিক ও অনুগত থেকে দারুণ অভিনয় করেছে।"
মহড়ার নেপথ্যের প্রতিকূলতা নিয়ে তিনি জানান, "নিউইয়র্কে সবার কাজের সূচি আলাদা, দূরত্ব অনেক এবং যানজট নিত্যদিনের সঙ্গী। কাজের ক্লান্তি শেষে অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে অনেকে বেজমেন্ট বা লিভিংরুমে মহড়ায় অংশ নিয়েছেন। ভালোবাসা ছাড়া এই ত্যাগ সম্ভব নয়।"
দলের নামকরণ 'থিয়েটার ৭১' প্রসঙ্গে এই নাট্যজন বলেন, "১৯৭১ আমাদের অহংকার, রক্ত দিয়ে পাওয়া স্বাধীনতা ও চেতনা। সেই আদর্শ থেকেই দলের এই নাম। ইতিপূর্বে আমার নির্দেশনায় 'পেন্ডুলাম' নাটকটির আটটি প্রদর্শনী বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। থিয়েটার ৭১ থেকে আমরা নাটকটি আবারও সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছি। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে নতুনদের নিয়ে কর্মশালাভিত্তিক নিয়মিত প্রযোজনা এবং নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে সাবটাইটেলসহ 'অফ-ব্রডওয়ে' মঞ্চে বাংলা নাটক উপস্থাপন করা।"
অনুষ্ঠানের মাঝে ফেসবুক লাইভ থেকে দর্শকদের পাঠানো বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন অতিথি। বাস্তব জীবন ও অভিনয়ের পার্থক্য নিয়ে তিনি বলেন, "অভিনয় সাধনা ও দীর্ঘ চর্চার বিষয়। সবাই চাইলেই সহজে এটি করতে পারেন না। আর অন্যের কান্না দেখে দর্শকের চোখে জল আসার মধ্যেই একজন অভিনয়শিল্পীর সার্থকতা নিহিত।"
প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে তিনি অভিভাবকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, "জোর করে কোনো সংস্কৃতি বা ভাষা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এতে উল্টো বিরক্তি তৈরি হয়। ঘরের পরিবেশেই বাংলা বই, গান, নাটক আর খাবারের আবহ ছড়িয়ে দিতে হবে। বড়দের শ্রদ্ধা করা এবং শিকড়ের গল্প শোনানো প্রয়োজন। শৈশব থেকেই ইতিবাচকভাবে যুক্ত করলে তারা নিজেদের শিকড় থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন হবে না।"
পেশাগত ব্যস্ততার মাঝে থিয়েটারের শক্তি পাওয়ার রহস্য এবং পারিবারিক সহযোগিতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে খাইরুল ইসলাম পাখি বলেন, "দিনের ১২ ঘণ্টা শিক্ষকতা ও রিয়েল এস্টেটের কাজে ব্যস্ত থাকার পরও থিয়েটার করি কেবল প্রাণের আনন্দে। আর দিনশেষে ঘরে ফিরে যদি পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন না পেতাম, তবে এই দীর্ঘ পথচলা অসম্ভব হতো। আমার স্ত্রী জ্যাকলিন এবং দুই সন্তান আল্লাদ ও গুঞ্জন মহড়া, প্রকাশনা থেকে শুরু করে টিকিট ব্যবস্থাপনা—সবকিছু সামলে দিয়ে আমাকে মঞ্চের কাজে নিরবচ্ছিন্ন সময় দিতে সাহস জুগিয়েছে।"
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন