https://www.prothomalony.com/
17992
north-america
আকাশ থেকে দেখলে জায়গাটাকে মনে হয় সাদা ফেনায় ঢাকা এক সমুদ্র। স্পেনের দক্ষিণে আলমেরিয়া প্রদেশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড জুড়ে লক্ষ লক্ষ প্লাস্টিকের গ্রিনহাউস, যা মহাকাশ থেকেও চোখে পড়ে।তাই এই অঞ্চলের ডাকনাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সি অব প্লাস্টিক’। এখান থেকেই শীতকালে ইউরোপের বাজারে যায় বছরে সাড়ে তিন মিলিয়ন টনের বেশি টমেটো, শসা, মরিচ আর তরমুজ। হিসাব বলছে, প্রায় পাঁচশো মিলিয়ন মানুষের খাদ্যতালিকা সচল রাখে এই একটুকরো জমি। কিন্তু এই সবুজ-সাদা ঐশ্বর্যের নিচে চাপা পড়ে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতা, যা ইউরোপের ঝকঝকে ভাবমূর্তির সঙ্গে বড় বেমানান।
ঘানার একজন গণিত শিক্ষক ছিলেন আমোয়াতেং ফস্টার। বয়স চুয়াল্লিশ। সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে, লিবিয়া হয়ে, ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে অবশেষে ইতালি ও পরে স্পেনে পৌঁছান তিনি—এক দীর্ঘ, বিপজ্জনক যাত্রা, যার লক্ষ্য ছিল সন্তানদের জন্য একটু ভালো ভবিষ্যৎ। আজ তিনি থাকেন আলমেরিয়ার এক অনানুষ্ঠানিক বসতিতে, যেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানির সংযোগ নেই, ইট-কাঠ-টায়ার আর প্লাস্টিক জোড়া দিয়ে বানানো ঘরে হাজারো মানুষ বাস করেন—একবিংশ শতাব্দীর ইউরোপে যা কল্পনাতীত মনে হওয়ারই কথা। সিএনএনের অনুসন্ধানে নিহার শহরের আশপাশে অন্তত চারটি এমন বসতির সন্ধান মিলেছে।
ফস্টারের ভাষায়, বেড়ার বাইরে থেকে দেখলে হয়তো মনে হবে সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু ভেতরের বাস্তবতা মোটেই সুখকর নয়। প্রামাণ্য কাগজপত্র ছাড়া এখানে টিকে থাকা সহজ কাজ নয়—এই সত্যটাই তাঁর জীবনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে।
জুলাইয়ের শেষে মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় শত শত মানুষের ঢল যখন আছড়ে পড়েছিল, তখন ইউরোপের অভিবাসন বিরোধী রাজনীতিকরা সেই মানবিক সংকটের ছবিকে রাজনৈতিক পুঁজি বানাতে দেরি করেননি। স্পেন সরকারের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে ইউরোপের ডানপন্থী শিবির থেকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে মানবিক সংস্থাগুলোর প্রতি আক্রমণ—অভিযোগ ওঠে, তারাই নাকি অভিবাসীদের টেনে আনার কারণ।
আশি বছর বয়সী সিস্টার ফ্রান্সিসকা, যিনি মার্সিডারিয়ান সিস্টার্স অব চ্যারিটির স্থানীয় সমন্বয়কারী, এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, তাঁরা বা অন্য কোনো সংস্থা কাউকে এখানে আসার প্ররোচনা দেয় না—মানুষ আসে সম্মানজনক জীবনের খোঁজে, রুটির টুকরোর জন্য নয়। প্রতিদিন স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকে সংগৃহীত খাবার বিতরণ করেন তাঁরা, ভাষা শেখান, কাজের দক্ষতা তৈরির কর্মশালা চালান। সিস্টার এস্তেলা, বয়স একষট্টি, প্রতিটি মানুষের পরিচয় যাচাই করে খাবার তুলে দেন—কারও কাছে এটাই দিনের একমাত্র আহার।
খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের বাইরে দেখা মেলে ছত্রিশ বছর বয়সী মরক্কান নারী আমালের সঙ্গে। সাত মাস আগে স্ট্রবেরি তোলার কাজে স্পেনে আসেন তিনি, সন্তানদের রেখে আসেন মা আর বোনের কাছে। নিয়োগকর্তার সঙ্গে মতবিরোধে চাকরি হারিয়ে এখন তিনি কাগজপত্রহীন, কর্মহীন, সন্তানদের থেকে দূরে। মোবাইল ফোনে সন্তানদের ছবি দেখাতে দেখাতে চোখের জল আটকাতে পারেননি তিনি।
এই অঞ্চলে অনিয়মিত অভিবাসনের যে পথ, ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স যাকে বলে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুট, তাতে সামগ্রিকভাবে এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আগের তুলনায় সংখ্যা কমলেও কিছু কিছু পথে বরং বেড়েছে। সরকারি হিসাবে সত্তর হাজারের বেশি মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা নিবন্ধনের আওতায় কৃষিকাজে যুক্ত, কিন্তু শ্রমিক সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব বলছে প্রকৃত সংখ্যা এক লাখ দশ হাজারের বেশি, যার নব্বই শতাংশই বিদেশি বংশোদ্ভূত, এবং তাদের বড় অংশই কাগজপত্রহীন।
নথিভুক্ত শ্রমিকরা ঘণ্টায় ন্যূনতম মজুরি আট ইউরো পান, যদিও শোষণের অভিযোগও কম নেই। কিন্তু কাগজপত্রহীনদের অনেকে জানিয়েছেন, তাঁরা পান তার প্রায় অর্ধেক—ঘণ্টায় চার থেকে পাঁচ ইউরো। প্রচণ্ড গরমে, একশো চার ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায়, নুয়ে পড়া অবস্থায় একটানা কাজ করে এই সামান্য আয়ে সঞ্চয়ের প্রশ্নই ওঠে না—এমনটাই আক্ষেপ ফস্টারের। স্পেন সরকার অবশ্য একটি নিয়মিতকরণ কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে অন্তত পাঁচ মাস ধরে দেশে অবস্থানরত প্রায় পাঁচ লাখ কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে বৈধতার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই নির্ভরতার পাশাপাশি বাড়ছে এক ভিন্ন স্রোত। আরবি ও ফরাসি ভাষার সাইনবোর্ড এখন আলমেরিয়ার অলিগলিতে দৃশ্যমান, নতুন রেস্তোরাঁ-দোকান-মসজিদ গড়ে উঠেছে। কিন্তু তার পাশাপাশি দেয়ালে দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে বিদ্বেষী গ্রাফিতি, যাতে লেখা—মুসলিমদের প্রতি অনাস্থার বার্তা। ২০১৮ সালে আন্দালুসিয়া অঞ্চল থেকেই স্পেনের কট্টর ডানপন্থী দল ভক্স প্রথম আঞ্চলিক নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছিল, যা পরে তাদের জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে দেয়। এবার আলমেরিয়ার ‘লা কানিয়াদা’ এলাকায় ভক্স আঞ্চলিক নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান দখল করে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দলকে পেছনে ফেলে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রোসেন্দো, বয়স আটষট্টি, মনে করেন অভিবাসীরা মিশে যেতে চান না। প্রতিবেশী ফ্রান্সিসকো, বয়স উনআশি, আরও কড়া ভাষায় বলেন—এটা তাঁর চোখে অস্ত্রবিহীন এক আগ্রাসন। অথচ স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফুনকাসের এক সমীক্ষা বলছে, স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসীদের নব্বই শতাংশই আসেন লাতিন আমেরিকা থেকে, উত্তর আফ্রিকা থেকে আগমন বরং কমছে। বাস্তবতা আর জনমনের ধারণার মধ্যে এই ফারাকই যেন গোটা ইউরোপ জুড়ে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির জ্বালানি জোগাচ্ছে।
এই পুরো চিত্রটাই একটা পুরনো, প্রায় বিদ্রূপাত্মক দ্বন্দ্বকে সামনে আনে—যে শ্রমশক্তি ইউরোপের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, সেই একই শ্রমশক্তিকে রাজনৈতিক পরিসরে করা হয় অনাকাঙ্ক্ষিত। মধ্যস্বত্বভোগী আর সুপারমার্কেট চেইনগুলোর সর্বনিম্ন দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে খামার মালিকরা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, আর সেই নির্ভরতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ফস্টারের মতো মানুষেরা। তাঁর নিজের ভাষায়, তাঁদের প্রয়োজন আছে বলেই তিনি এখানে আছেন—এটা একটা পারস্পরিক লেনদেন।
স্পেন সরকার অবশ্য এই সমালোচনার মুখে পিছু হটছে না। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ নিজের নিয়মিতকরণ কর্মসূচিকে বর্ণনা করেছেন যুক্তিসঙ্গত, ন্যায্য ও দায়িত্বশীল নীতি হিসেবে। কিন্তু আলমেরিয়ার প্লাস্টিক-ঢাকা মাঠের ভেতরে যে মানুষগুলো ঘাম ঝরিয়ে ইউরোপের শীতকালীন খাদ্যভাণ্ডার ভরিয়ে তোলেন, তাঁদের নিজের জীবনটাই থেকে যায় অনিশ্চয়তার প্লাস্টিকে মোড়া—দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না এমন এক মর্যাদার প্রতিশ্রুতি।
(সূত্র: সিএনএন)
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন