https://www.prothomalony.com/

17491

canada

কানাডা

স্বস্তিতে নেই কানাডার আশ্রয়প্রার্থীরা, বাড়ছে অনিশ্চয়তা

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ ০২:৪০

কানাডায় আশ্রয়প্রার্থী বা রিফিউজি আবেদনকারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ হলো—অনিশ্চয়তা। দুই-তিন বছর ধরে শুনানির অপেক্ষা, নতুন অভিবাসন আইনের কড়াকড়ি এবং আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে হাজারো আশ্রয়প্রার্থী ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

কানাডায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিফিউজি আবেদনের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজারের চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে বিপুল সংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী ও ভিজিটরকে ভিসা দেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ, শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডে (আইআরবি) মামলার জট দেশটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে টরন্টো ও মন্ট্রিয়ল শহর সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। একসময় আশ্রয়প্রার্থীদের ঢল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেককে পার্ক, বাসস্টপ কিংবা সাবওয়ে স্টেশনে রাত কাটাতে হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও নীতিবিশ্লেষকদের একটি অংশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সরকারের শিথিল ভিসানীতিকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন।

বাংলাদেশ থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিজিটর ভিসায় কানাডায় এসে আশ্রয় আবেদন করেছেন। টরন্টোর ড্যানফোর্থ এবং মন্ট্রিয়লের পার্ক এক্সটেনশন ও প্লামন্ডন এলাকায় বর্তমানে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের বড় উপস্থিতি দেখা যায়। অনেকেই বিমানবন্দরেই কিংবা পরে শহরে এসে রিফিউজি ক্লেইম দাখিল করেছেন।

তবে আবেদন করলেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কানাডা সরকার এখন আবেদনগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে যাচাই করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি আবেদন মুলতবি অবস্থায় ছিল। ফলে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের কেসগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ইমিগ্রেশন আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের রিফিউজি আবেদন অনুমোদনের হারও কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে অনুমোদনের হার ছিল ৭১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ৭৭ শতাংশ হয়। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে তা নেমে আসে ৫৬ শতাংশে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে অনুমোদনের হার দাঁড়ায় প্রায় ৫০ শতাংশে।

এদিকে চলতি বছর পাস হওয়া বিল সি-১২ আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। নতুন আইনে ২০২০ সালের ২৪ জুনের পর কানাডায় প্রবেশ করা কেউ যদি দেশে আসার এক বছরের বেশি সময় পর আশ্রয় আবেদন করেন, তাহলে সেই আবেদন সরাসরি অগ্রাহ্য করা হতে পারে। একই সঙ্গে অনিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত পেরিয়ে আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সরকারকে দ্রুত আবেদন বাতিল ও বহিষ্কারের অতিরিক্ত ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতির অংশ হিসেবে ২০২৫-২০২৭ অভিবাসন পরিকল্পনায় স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসী গ্রহণের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কানাডা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালে ৩ লাখ ৯৫ হাজার, ২০২৬ সালে ৩ লাখ ৮০ হাজার এবং ২০২৭ সালে ৩ লাখ ৬৫ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের সংখ্যাও সীমিত করা হচ্ছে।

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডা এখনো আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। যেসব আবেদনকারী সময়মতো আবেদন করেন, শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন, নিজ দেশে নির্যাতন বা প্রাণহানির ঝুঁকির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দেন এবং কানাডার সমাজে ইতোমধ্যে ইতিবাচকভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন, তাদের আবেদন গ্রহণের সম্ভাবনা এখনও উল্লেখযোগ্য।

একসময় সুযোগ ও আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিত কানাডা বর্তমানে মানবিক দায়বদ্ধতা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই হাজারো বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর প্রতিটি দিন কাটছে অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।

কানাডা থেকে আরো পড়ুন