https://www.prothomalony.com/

18269

new-york

নিউইয়র্ক

নিউইয়র্কে ষষ্ঠ ভাসানী সম্মেলন, নতুন কমিটি গঠিত

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৪৭

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় নেতার মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ভাসানী সম্মেলনের বক্তারা। তারা বলেন, মওলানা ভাসানীকে নিয়ে আরও গবেষণা ও অধ্যয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক দর্শন, মানবতাবাদী চিন্তা ও শোষণবিরোধী অবস্থান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইনকের উদ্যোগে ষষ্ঠ ভাসানী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ভাসানীকে নিয়ে নানা অপপ্রচার হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তিনি কোনো সম্প্রদায়বিদ্বেষী নেতা ছিলেন না; বরং হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সর্বস্তরের মানুষের অধিকার আদায়ের নেতা ছিলেন।

সম্মেলনে ১০ দফা রেজ্যুলেশন গ্রহণ করা হয়। এতে মওলানা ভাসানীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে স্মরণ করার দাবি জানানো হয়।

এবারের সম্মেলনে প্রধান অতিথি ও প্রধান আলোচক ছিলেন ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, বিশিস্ট লেখক ও গবেষক প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান। গেস্ট অর্ব অর্নার ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয় উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া সাথী, ভাসানী চর্চা কেন্দ্র-কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার এবং ভাসানী গবেষক জুনাইদ এহসান।

ফাউন্ডেশনের সভাপতি বীর মুত্তিযোদ্ধা আলী ইমাম শিকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মূল পর্বের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়। এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হওয়ার পর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইনক’র সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসের এবং ভাসানীর উপর প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তফা করিম ফরিদ।

এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন ষষ্ঠ মওলানা ভাসানী আন্তর্জাতিক সম্মেলন-২০২৬ উদযাপন কমিটির পৃষ্ঠপোষক সৈয়দ টিপু সুলতান, আহ্বায়ক গিয়াস আহমেদ, বিশিষ্ট রাজনীতিক নাহিদুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সম্মেলন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব শাহাব উদ্দিন সাগর।

অনুষ্ঠানে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের নেতা। ক্ষমতা দখলের চেয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ভাসানীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ। তিনি ক্ষমতার কাছে যাননি; বরং ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন।

মওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশীয় শোষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও ভাসানী আজীবন সোচ্চার ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে তিনি একই সূত্রে দেখতেন। তিনি বলেন, ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ও চিন্তাধারাকে কেবল স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তার জনমুখী রাজনীতি, মানবতাবাদী দর্শন এবং শোষণবিরোধী অবস্থান নতুন করে পাঠ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতের একজন নেতাকে স্মরণ করা নয়। তাকে স্মরণ করার অর্থ দেশের কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসা।

বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা প্রসঙ্গে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, একটি ব্যক্তি, দল কিংবা নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে দেশের ইতিহাসকে বিচার করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ধারা আড়ালে থেকে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল। সেই ইতিহাসে মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনের অবদান রয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একজনকে এককভাবে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়েও ঐতিহাসিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য কওে তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে একাধিক প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বের ভূমিকা স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসও বিভিন্ন নেতা, আন্দোলন ও রাজনৈতিক ধারার সম্মিলিত অবদানের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মওলানা ভাসানীর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভাসানী কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতি করেননি। হিন্দু-মুসলমানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ধর্ম, সম্প্রদায় বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নই ছিল তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।

মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা তুলে ধরে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, আসাম থেকে পূর্ববাংলা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও তিনি ক্ষমতাসীনদের অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মময় জীবন আলোচনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন। বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার জনগণের সরকার বলেই তিনি সন্তোষে মাওলানার মাজার জিয়ারত করার পর টাঙ্গাইলে কৃষক কর্ড কর্মসূচীর ইদ্বোধন করেন।

সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ম্যাগাজিনের মোড়ক উম্মোচনও করা হয় মূল মঞ্চে। কবিতা আবৃত্তি করেন সাদেক খান ও হারুন উজ জামান ভূঁইয়া। সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পী  মরিয়ম মারিয়া, নীলিমা শশী ও করিম হাওলাদার। এই পর্ব সঞ্চালনায় ছিলেন সম্মেলন উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক এসএম ফেরদৌস।

সম্মেলনে সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা সম্পাদক ও টাইম টেলিভিশন-এর সিইও আবু তাহের, এটিএন বাংলা ইউএসএ’র পরিচালক ফখরুল আলম, সাপ্তাহিক প্রবাস সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ, সংসদ সদস্য মমতাজ আলো এবং ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ হোসেন খান, যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ, সমন্বয়কারী কাজী আজম সহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ভাসনী ভক্ত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী-আমেরিকান উপস্থিত ছিলেন।

নতুন কমিটি গঠিত

সম্মেলনে সংগঠনের কার্যকরী কমিটির মেয়াদ চলতি বছরে শেষ হওয়ায় নতুন কমিটি ঘোষণা করেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসের। এ কমিটি ২০২৭-২০৩০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। কমিটি ঘোষণার সময় সম্মেলনোত্তর কার্যকরী কমিটির বৈঠকে উপদেষ্টা মন্ডলী গঠন করা হবে বলেও জানানো হয়। এতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমাম সভাপতি ও সাংবাদিক শাহাব উদ্দিন সাগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।

২৫ সদস্যের কমিটির অন্যান্য কর্মকর্তারা হলেন: সহ সভাপতি- মোস্তফা করিম ফরিদ, সহ সভাপতি- কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম, যুগ্ম সম্পাদ- নাজমুল আলম শ্যামল, সাংগঠনিক সম্পাদক- এস এম ফেরদৌস, কোষাধ্যক্ষ- নূর আমিন, ওভারসিস সম্পাদক- আতাউর রহমান আতা, প্রচার, তথ্য ও  প্রযুক্তি সম্পাদক- তানভির করিম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক- নার্গিস রহমান, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক- দেলোয়ার হোসেন শিপন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক- সৌমিত্র দস্তিদার। কার্যকরী সদস্যরা হলেন: এম এ সাদেক, শাহ আলম দুলাল, খন্দকার ফরহাদ, মাহমুদ খান তাসের, কিউ জামান, আবদু রহিম হাওলাদার, এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদ, ফারুক হোসেন মজুমদার, বাসেত রহমান, বিল্লাল চৌধুরী, মইন উদ্দিন নাসের (পদাধিকার বলে সদস্য)।
 

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন