https://www.prothomalony.com/
18419
new-york
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর সাম্প্রতিক যে অসৌজন্যমূলক ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল একজন ব্যক্তির অসম্মান নয়; বরং তা আমাদের প্রবাসী রাজনীতির দেউলিয়াত্বের এক নির্মম আয়না। হুইলচেয়ারে বসা ৮৪ বছর বয়সী একজন নোবেল বিজযী প্রবীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ্যে ঘিরে ধরে "কিলার" বা "টেরোরিস্ট" বলে চিৎকার করা এবং হেনস্তা করার এই দৃশ্য -আমেরিকার মাটিতে ঘটেছে। প্রশ্ন একটাই, আমরা প্রবাসে নিজেদের কী প্রমাণ করলাম?
এই হামলা শারীরিক ছিল না, ছিল মৌখিক এবং ইমোশনাল। কিন্তু অপমানের তীব্রতায় তা শারীরিক হামলার চেয়ে কম নয়। একজন অসুস্থ, বয়স্ক মানুষকে বিমানবন্দরের মতো একটি আন্তর্জাতিক পাবলিক স্পেসে হেনস্থা করা, এটা সাহস নয়, এটা কাপুরুষতা। যারা এই কাজ করেছে, তারা ড. ইউনূসকে ছোট করতে গিয়ে আসলে নিজেদের এবং পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ছোট করেছে বিশ্বের কাছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রবাসের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অংশ নিজেদের চরম কূপমন্ডূক, অসহিষ্ণু এবং প্রমত্ত হিসেবেই প্রমাণ করেছে। আমরা বিশ্ববাসীর সামনে ফুটিয়ে তুলেছি যে, দেশের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে গেলেও আমাদের ভেতরের রাজনৈতিক হিংস্রতা, হীনম্মন্যতা এবং শিষ্টাচারবর্জিত সংস্কৃতি একটুও বদলায়নি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বসে যারা এই ধরনের আচরণ করেন, তারা মূলত গণতন্ত্রের লেবাস পরে ফ্যাসিবাদী মানসিকতাকেই লালন করছেন।
অনেকে বলছেন, এটা বাকস্বাধীনতা। আমেরিকায় যে কেউ যে কাউকে কিছু বলতে পারে। এই যুক্তি যারা দিচ্ছেন, তারা বাকস্বাধীনতার অর্থই বোঝেন না।
বাকস্বাধীনতা মানেই কি এমন আচরণ? একেবারেই না।
আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বাকস্বাধীনতাকে রক্ষা করে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আপনি যা খুশি তাই করবেন। বাকস্বাধীনতার অর্থ হলো রাষ্ট্র আপনার মত প্রকাশের জন্য আপনাকে জেলে দেবে না, আপনাকে গুম করবে না। এর অর্থ এই নয় যে আপনি বিমানবন্দরে একজন যাত্রীকে ঘিরে ধরে হ্যারাসমেন্ট করবেন, গালাগালি করবেন, এবং সেটা বৈধ হয়ে যাবে।
আমেরিকান আইনে বাকস্বাধীনতার সুস্পষ্ট সীমানা আছে। হ্যারাসমেন্ট, টার্গেটেড ইন্টিমিডেশন, হেইট স্পিচ যা সহিংসতাকে উস্কে দেয়, তা বাকস্বাধীনতার আওতায় পড়ে না। জেএফকে একটি ফেডারেল স্থাপনা। সেখানে একজন ব্যক্তিকে টার্গেট করে চিৎকার করা, পথ আটকানো, ভীতি প্রদর্শন করা - এটা ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট নয়, এটা ডিসঅর্ডারলি কন্ডাক্ট। আজ যদি এই একই আচরণ কোনো আমেরিকান নাগরিক অন্য দেশের কোনো প্রেসিডেন্টের সাথে করতো, তাহলে সিক্রেট সার্ভিস বা পোর্ট অথরিটি পুলিশ তাকে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে দিত।
আমরা যারা আমেরিকায় থাকি, আমরা ভুলে যাই যে বাকস্বাধীনতা একটি দায়িত্ব, কোনো অস্ত্র নয়। আপনি সরকারের সমালোচনা করতে পারেন, আপনি ড. ইউনূসের নীতির সমালোচনা করতে পারেন, আপনি তার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে পারেন প্ল্যাকার্ড নিয়ে, স্লোগান দিয়ে। কিন্তু একজন হুইলচেয়ারে থাকা মানুষকে "টেরোরিস্ট" বলে চিৎকার করা সমালোচনা নয়, এটা ঘৃণা। আর ঘৃণা কখনো বাকস্বাধীনতা ছিল না।
এই ঘটনায় প্রবাসে আমাদের কী পরিচয় দিলাম? আমরা প্রমাণ করলাম যে দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে এসেও আমরা দেশের নোংরা রাজনীতির আবর্জনা বয়ে নিয়ে এসেছি।
আমেরিকা আমাদের কাছে কী আশা করে? আমেরিকা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, কাজ দিয়েছে, আমাদের সন্তানদের স্কুল দিয়েছে। তারা আশা করে আমরা এখানকার আইন, শিষ্টাচার এবং সহনশীলতাকে সম্মান করবো। তারা আশা করে আমরা ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকানদের মতো ভদ্রভাবে দ্বিমত পোষণ করবো, রাস্তার মাস্তানের মতো নয়।
যখন জেএফকে-তে একজন বাংলাদেশি আরেকজন বাংলাদেশিকে হেনস্থা করে, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমেরিকান, ল্যাটিনো, ভারতীয় বা চাইনিজ যাত্রী কী ভাবে? তারা ভাবে, এই কমিউনিটি এখনো সভ্য হয়নি। তারা ভাবে, এরা নিজের দেশকে নিজেরাই সম্মান করে না। এর ফল ভোগ করতে হয় আমাদের সবাইকে। যখন আমরা সিটি হলে কোনো দাবি নিয়ে যাই, যখন আমরা আমাদের কমিউনিটির জন্য কোনো অধিকার চাই, তখন এই ভিডিওগুলোই আমাদের বিরুদ্ধে যায়। আমাদের বলা হয়, তোমরা তো নিজেরাই নিজেদের নোবেল বিজয়ীকে সম্মান করতে জানো না, তোমাদের আমরা কেন সম্মান করবো?
আমরা প্রবাসে দুই ধরনের বাংলাদেশি পরিচয় তৈরি করেছি। এক ধরনের পরিচয় হলো ড. ইউনূসের পরিচয়। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে দারিদ্র্য নিয়ে কথা বলেন, যখন তিনি অলিম্পিকে যান, যখন তিনি নোবেল মঞ্চে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করেন, তখন আমেরিকানরা আমাদের সম্মান করে। তারা বলে, ওই যে ছোট দেশ, যেখান থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের আইডিয়া এসেছে।
আরেক ধরনের পরিচয় হলো এই বিমানবন্দরের চিৎকার করা দলটির পরিচয়। যারা প্রমাণ করে আমরা এখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালাগালি এবং দলবাজির বাইরে বের হতে পারিনি।
সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, এই কাজটি করেছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা বলে পরিচয় দেওয়া একটি গোষ্ঠী। একটি দল যে টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় ছিল, এখন ক্ষমতা হাত ছাড়া। যে দলটি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের দল বলে দাবি করে, সেই দলের কর্মীদের কাছ থেকে আমরা এর চেয়ে বেশি পরিণত আচরণ আশা করি। আপনি আপনি ড. ইউনূস সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু এর ভাষা কি "কিলার টেরোরিস্ট"?
এই অন্ধকারের মধ্যেও আলোর রেখা হয়ে এসেছেন ড. ইউনূস নিজে। তিনি শান্ত ছিলেন। হুইলচেয়ারে বসে, এই অপমানের মুখেও তিনি কোনো পাল্টা গালি দেননি, তিনি উত্তেজিত হননি, তিনি কারো দিকে আঙুল তোলেননি। তিনি যে পরিচয় দিলেন, তা হলো রাষ্ট্রনায়কের পরিচয়।
তার নীরবতা ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। তিনি প্রমাণ করলেন, ক্ষমতা চিৎকারে নয়, সংযমে। তিনি প্রমাণ করলেন, কেন তিনি নোবেল বিজয়ী আর রাস্তায় চিৎকার করা মানুষটি কেন শুধুই একজন কর্মী। একজন মানুষের উচ্চতা মাপা হয় তার প্রতিপক্ষ যখন নিচে নামে, তখন তিনি কতটা ওপরে থাকতে পারেন, তা দিয়ে। ড. ইউনূস সেই পরীক্ষায় পাশ করেছেন।
শেষ কথা হলো, প্রবাসে আমরা কী হতে চাই? আমরা কি আমেরিকায় থেকেও কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি করবো, নাকি আমরা এই দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থেকে কিছু শিখবো?
যদি আমাদের দ্বিমত থাকে, আসুন টাউন হলে যাই, ডিবেট করি, লিফলেট বিলি করি, ভোটের মাধ্যমে জবাব দিই। কিন্তু জেএফকে-র মতো জায়গায় একজন বয়স্ক মানুষকে ঘিরে ধরে অপমান করে আমরা শুধু ড. ইউনূসকে নয়, লাল সবুজ পতাকাটাকেই অপমান করেছি।
এই লজ্জা ড. ইউনূসের নয়, এই লজ্জা আমাদের।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন